শুক্রবার স্থানীয় সময় গভীর রাতে ভেনেজুয়েলায় একাধিক বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ভোরের আলো ফোটার আগে রাজধানী কারাকাসে একের পর এক বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে শহরটি। এর কিছুক্ষণ পরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করেছে এবং তাঁদের দেশটির বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
একজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে এভাবে আটক করার ঘটনা নজিরবিহীন। তবে এই হামলা ও গ্রেপ্তার ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক মাসের তীব্র চাপ প্রয়োগের ধারাবাহিকতারই অংশ। গত সেপ্টেম্বর থেকে ভেনেজুয়েলার উপকূলে বড় আকারের নৌবহর মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক পাচারের অভিযোগে নৌযানে বিমান হামলা চালানো হয় এবং ভেনেজুয়েলার তেলবাহী জাহাজ জব্দ করা হয়।
এসব হামলায় অন্তত ১১০ জন নিহত হয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এসব হামলা যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে।
ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, দেশটির বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল মজুতের ওপর নিয়ন্ত্রণ পেতেই এই অভিযান চালানো হচ্ছে।
মাদুরোকে আটক ও ভেনেজুয়েলায় বোমাবর্ষণ যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে একটি গুরুতর ও নাটকীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাসীন শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত।
পরিস্থিতি এখানে এসে দাঁড়াল কীভাবে
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে লক্ষ্য করে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতিতে এগোন। তিনি মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচার, অবৈধ অভিবাসনসহ আমেরিকাজুড়ে অস্থিতিশীলতা তৈরির অভিযোগ তোলেন।
গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোর মাথার দাম ৫ কোটি ডলার ঘোষণা করে। তাঁকে বিশ্বের অন্যতম বড় মাদক পাচারকারী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়।
ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার অপরাধী চক্র ‘ত্রেন দে আরাগুয়া’সহ কয়েকটি গোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর ক্যারিবীয় সাগরে কথিত মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা শুরু হয়। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলার তেল ট্যাংকার জব্দ এবং দেশটির চারপাশে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করা হয়।
ট্রাম্প প্রকাশ্যেই ভেনেজুয়েলায় সরকার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেন। নভেম্বরের শেষ দিকে তিনি মাদুরোকে ক্ষমতা ছাড়ার আলটিমেটাম দেন এবং নিরাপদে দেশ ছাড়ার প্রস্তাবও দেন। মাদুরো সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তিনি ‘দাসত্বের শান্তি’ চান না। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভেনেজুয়েলার তেল দখলের চেষ্টা করার অভিযোগ তোলেন।
চাপ বাড়তে থাকলেও কারাকাস সরকারের প্রতিক্রিয়া অনেক সময় বিভ্রান্তিকর ছিল। মাদুরো একাধিকবার বলেন, ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ চায় না। একটি অনুষ্ঠানে তাঁকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নাচতে নাচতে ‘না যুদ্ধ, হ্যাঁ শান্তি’ গান গাইতে দেখা যায়। এ সময় তিনি ট্রাম্পের নাচের ভঙ্গিরও অনুকরণ করেন।
আটকের মাত্র দুই দিন আগে টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রকে ভেনেজুয়েলার তেল খাতে বিনিয়োগের আমন্ত্রণও জানান।
যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার দ্বন্দ্বের কারণ কী
১৯৯৯ সালে হুগো শাভেজ ক্ষমতায় আসার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ে। সমাজতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থানের কারণে শাভেজ যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান ও ইরাক আগ্রাসনের বিরোধিতা করেন এবং কিউবা ও ইরানের মতো দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন।
২০০২ সালে একটি অভ্যুত্থানচেষ্টার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের অভিযোগ তোলার পর সম্পর্ক আরও খারাপ হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রাজনীতিক, বিশেষ করে রিপাবলিকান দলের কট্টর অংশ, ভেনেজুয়েলার সমাজতান্ত্রিক সরকারকে কিউবার মতোই যুক্তরাষ্ট্রের চিরাচরিত প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে আসছে।
শাভেজ ক্ষমতা সুসংহত করার সময় বিরোধীদের দমন করেন এবং বেসরকারি খাতের বড় অংশ রাষ্ট্রীয়করণ করেন। এতে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা বাড়ে। মাদুরো ২০১৩ সালে ক্ষমতায় আসার পর সম্পর্ক আরও অবনতির দিকে যায়।
ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরো সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করে ২০১৯ সালে পার্লামেন্ট স্পিকার হুয়ান গুইদোকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাদুরো বড় ব্যবধানে পরাজিত হন বলে ধারণা করা হয়। বিরোধী দল ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের যাচাই করা ভোটের ফলাফলে এদমুন্দো গনসালেস বিজয়ী হন। বাইডেন প্রশাসনও তাঁকে স্বীকৃতি দেয়। তবে মাদুরো ক্ষমতা ছাড়েননি; বরং কঠোর দমন-পীড়ন শুরু করেন।
ডিসেম্বরে ট্রাম্প প্রশাসন তথাকথিত ‘ট্রাম্প করোলারি’ (ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির একটি ধারণা) প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, পশ্চিম গোলার্ধে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকতে হবে এবং প্রয়োজন হলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের দখল নিতে সামরিক শক্তি ব্যবহার করা যাবে।
নিকোলা মাদুরো কে এবং কেন তাঁকে আটক করলেন ট্রাম্প
১৯৬২ সালে কারাকাসে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেন মাদুরো। তাঁর বাবা ছিলেন বামপন্থী রাজনীতির একনিষ্ঠ কর্মী। বাবার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মাদুরো উচ্চশিক্ষার বদলে রাজনৈতিক সংগঠক হিসেবে প্রশিক্ষণ নিতে কিউবায় পাড়ি জমান।
পরবর্তী সময়ে কারাকাসে ফিরে তিনি পাবলিক বাসের চালক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ২০১৩ সালে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হন নিকোলা মাদুরো। এর আগে তিনি হুগো শাভেজের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন এবং ২০০৬-১৩ পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর শাসনকে স্বৈরাচারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জাতিসংঘের হিসাবে, ২০১৯ সাল পর্যন্ত অন্তত ২০ হাজার মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে।
ট্রাম্প সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বারবার মাদুরোর অপসারণ দাবি করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে মাদক ও অপরাধী পাঠানোর অভিযোগ তোলেন। তবে ট্রাম্পের এমন অভিযোগের পেছনে কোনো প্রমাণ ছিল না।
দীর্ঘদিনের উত্তেজনার পরও ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে এভাবে হঠাৎ আটক করা ভেনেজুয়েলা কর্তৃপক্ষকে বিস্মিত করেছে।
এখন কী হতে পারে
ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগ্রাসনের’ বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি একে ‘স্বাধীনতার লড়াই’ বলে আখ্যা দেন।
মাদুরো আটক হলেও ভেনেজুয়েলার সামরিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো এখনো বহাল রয়েছে। তবে এটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সূচনা, নাকি এককালীন অভিযান; তা স্পষ্ট নয়।
এদিকে, বিরোধী নেত্রী ও নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত মারিয়া কোরিনা মাচাদো যুক্তরাষ্ট্রকে দেশে গণ-অভ্যুত্থানে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন।
লাতিন আমেরিকা বিশেষজ্ঞ ডগলাস ফারাহ মনে করেন, ‘ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর হামলার পর দীর্ঘস্থায়ী বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে, যার কোনো স্পষ্ট সমাধান থাকবে না।’
তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নিশ্চিত করেছেন, মাদুরোকে আটকের পর ভেনেজুয়েলায় আর বড় কোনো সামরিক অভিযানের প্রয়োজনীয়তা দেখছে না ওয়াশিংটন। রিপাবলিকান সিনেটর মাইক লি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও আমাকে জানিয়েছেন, মাদুরো এখন মার্কিন হেফাজতে। যেহেতু তিনি আটক হয়েছেন, তাই রুবিও মনে করছেন, ভেনেজুয়েলায় বর্তমানে আর কোনো সামরিক পদক্ষেপের প্রয়োজন নেই।’
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও লাতিন আমেরিকায় বামপন্থী বা কমিউনিস্ট ভাবাদর্শের কট্টর বিরোধী। বিশ্লেষকদের মতে, রুবিওর পরিকল্পনা হলো ভেনেজুয়েলায় মাদুরোকে সরিয়ে দেওয়া হলে কিউবার কমিউনিস্ট সরকারও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়বে। এতে করে পুরো অঞ্চলে মার্কিনবিরোধী শক্তি দুর্বল হয়ে যাবে এবং ওয়াশিংটনের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে।