হোম > বিশ্লেষণ

আমিরাতের ওপেক ত্যাগ: শুধু তেল নয়, পারস্য উপসাগরে নতুন বিরোধের ইঙ্গিত

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ছবি: এএফপি

দশকের পর দশক ধরে অর্গানাইজেশন অব দ্য পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ বা ওপেক কেবল একটি তেল উৎপাদনকারী জোট হিসেবে পরিচিত ছিল না, বরং উপসাগরীয় দেশগুলোর সম্মিলিত সার্বভৌমত্ব ও অভিন্ন স্বার্থের প্রতীক ছিল। পারস্য উপসাগরের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য এটি ছিল এমন এক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে তারা সম্মিলিতভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারত এবং পশ্চিমা ক্রেতাদের কাছে অভিন্ন সুর প্রকাশ করত। তবে সেই প্রাতিষ্ঠানিক ঐক্যে বড় ধরনের ফাটল ধরেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ১ মে থেকে ওপেকের সদস্যপদ এবং এর সহযোগী জোট ওপেক প্লাস থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

এই সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক ব্যাখ্যা হিসেবে অনেকে জ্বালানি নীতি, নমনীয়তা এবং উৎপাদন সক্ষমতার কথা বলছেন। আমিরাতের জ্বালানিমন্ত্রী সুহাইল আল মাজরুই এই সিদ্ধান্তকে দেশটির দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতি, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে তুলে ধরেছেন।

বাজার বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করেছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকাও আমিরাতের এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হতে পারে। এ ছাড়া কিছু বিশ্লেষক আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির দৈনিক পাঁচ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদনের উচ্চাভিলাষ এবং ওপেকের নির্ধারিত কোটার সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তবে এসব দিক ছাপিয়ে আসল সত্যটি হলো, এটি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই প্রস্থানের পেছনে মূলত রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যকার গভীর আঞ্চলিক বিরোধ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে দুই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সৌদি-আমিরাত সম্পর্কের এই ফাটল নতুন কিছু নয়, তবে ২০২৫ সালের শেষের দিকে তা এক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর সৌদি আরবের বিমানবাহিনী ইয়েমেনের মুক্তা বন্দরে আমিরাত-সমর্থিত একটি সামরিক যান (অস্ত্রবাহী) লক্ষ্য করে হামলা চালায়। দুই মিত্রদেশের মধ্যে এই ধরনের ঘটনা ছিল নজিরবিহীন। এরপর রিয়াদ প্রকাশ্যে ইয়েমেন থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সব বাহিনী প্রত্যাহারের দাবি জানায় এবং ২০২৬ সালের শুরুর দিকে আবুধাবির প্রধান মিত্র সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি) ভেঙে দেওয়া হয়।

এটি কেবল একটি কৌশলগত বিবাদ নয়, বরং দুই দেশের গভীর কাঠামোগত দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ। সৌদি আরব যেখানে আরব রাষ্ট্রগুলোর অখণ্ডতা রক্ষায় নিজেদের আঞ্চলিক স্থিতিশীল শক্তিরূপে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, সেখানে সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০১৫ সাল থেকে লিবিয়া, সুদান, সোমালিয়া ও ইয়েমেনে শক্তির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের নীতি গ্রহণ করেছে।

তবে রিয়াদ আমিরাতের এই নীতিকে সহযোগী মনোভাব হিসেবে নয়, বরং নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার চরম মুহূর্তে ওপেকের অধীনে থাকা মানে রিয়াদের প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব মেনে নেওয়া। আর এই প্রস্থান সেই নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে আসার একটি সার্বভৌম পদক্ষেপ।

আমিরাতের এই প্রস্থানকে কেউ কেউ ২০১৯ সালে কাতারের ওপেক ছাড়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তবে এটি ভুল। কারণ, কাতার যখন ওপেক ছেড়েছিল, তখন দেশটি মূলত এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দিকে ঝুঁকছিল। এটি ছিল তাদের জন্য খাতভিত্তিক পুনর্বিন্যাস। কিন্তু সংযুক্ত আরব আমিরাত জোটের তৃতীয় বৃহত্তম উৎপাদনকারী দেশ, যাদের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১২ শতাংশ। তাদের এই প্রস্থান কোনো সাধারণ বিষয় নয়, বরং জোটের শরীরের একটি বড় অংশের বিচ্ছেদ। এটি ইঙ্গিত দেয় যে জোটের অন্যতম প্রধান দেশগুলো এখন মনে করছে, ভেতরে থাকার চেয়ে বাইরে থাকা তাদের স্বার্থের জন্য বেশি লাভজনক।

আমিরাতের এই সিদ্ধান্ত ওপেকের অভ্যন্তরীণ বৈধতার সংকটকেও স্পষ্ট করে তুলেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে ওপেকের কর্মকাণ্ডকে ওয়াশিংটনে এমন একটি সিস্টেম হিসেবে দেখা হয়, যা রুশ স্বার্থ রক্ষা করে এবং তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রেখে সরাসরি পুতিনের যুদ্ধের অর্থায়নে সহায়তা করে।

এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে, উপসাগরে মার্কিন সামরিক সহায়তা তেলের দামের সঙ্গে সম্পর্কিত। এখন আবুধাবি যখন ওপেক থেকে বেরিয়ে তেল উৎপাদনের স্বাধীন পথ বেছে নিয়েছে, তখন বিষয়টি স্পষ্ট হয়, তারা যুক্তরাষ্ট্রের ছায়ায় থাকা সেই পুরোনো জোটের কাঠামো থেকেও নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে। আবুধাবি এখন একাই তেলের ব্যারেল ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত আনুকূল্য পেতে চাইছে। ইরানের সরাসরি হামলার শিকার হওয়া এবং সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া আবুধাবির কাছে ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা এখন শুধু একটি পছন্দ নয়, বরং বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয়তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে আবুধাবির এই সিদ্ধান্তের আসল ক্ষতি কিন্তু সৌদি আরবের নয়। কারণ, দেশটির অর্থনীতি এই ধাক্কা সামলে নিতে সক্ষম। এর আসল ক্ষতি হলো পারস্যের জ্বালানি উৎপাদক দেশগুলোর সম্মিলিত শক্তির যে ধারণা ছিল তার। প্রশ্ন হলো, আঞ্চলিক যুদ্ধ ও জোট পরিবর্তনের এই প্রেক্ষাপটে আমিরাতকে হারিয়ে ওপেক কি তার ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করতে পারবে? আপাতত পরিস্থিতির বিচারে এর উত্তর—না।

ইরানের সঙ্গে স্থল বাণিজ্য পথ খুলে দিল পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র কি মেনে নেবে

ভারত কেন বাংলাদেশ সীমান্তের নদী-খালে সাপ-কুমির ছাড়তে চায়, এর প্রভাব কেমন

একটি দেশ বাদে পুরো আফ্রিকার জন্য চীনের ‘শূন্য শুল্ক’, কার কী লাভ

যুদ্ধে ইসরায়েলের আরও ঘনিষ্ঠ হলো আরব আমিরাত

২৫ বিলিয়ন নাকি ১ ট্রিলিয়ন ডলার—ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত ব্যয় কত

জনশক্তি রপ্তানি করে কি কোনো দেশের ধনী হওয়া সম্ভব

আমিরাতের ওপেক ত্যাগ: ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন ‘চুক্তি’র ফল নাকি আরও বড় খেলা

‘ওপেক’-এর পর আমিরাত কি অন্যান্য জোটও ত্যাগ করবে

ভ্যাটিকানের দ্বারস্থ সিলিকন ভ্যালি, ধর্ম ও বিজ্ঞানের বিরোধ কি মিটে যাচ্ছে

আমিরাতের ওপেক ত্যাগ তেলের বাজারে কতটা প্রভাব ফেলবে