২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ কেবল রণক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত তথ্যযুদ্ধের এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। ইরানের এই সংঘাত কেন এআই-জেনারেটেড বা ডিপফেক কনটেন্ট যুদ্ধের অস্ত্র হয়ে উঠেছে।
২০২৪ সালের নির্বাচন বা ২০২৩ সালের ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের সময় এআই কনটেন্ট উপস্থিত থাকলেও তা ছিল যৎসামান্য। কিন্তু ২০২৬ সালের ইরান সংঘাত চিত্রটি পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এখানে এআই কেবল বিভ্রান্তি ছড়ানোর মাধ্যম নয়, বরং যুদ্ধের একটি কৌশলগত সম্প্রসারণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের ‘কমিউনিটি নোটস’ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহে এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট-সংক্রান্ত ফ্ল্যাগ বা নোটের সংখ্যা ৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এটি এআই প্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়ার পর থেকে সর্বোচ্চ। বর্তমানে এক্সের প্রতি ১২টি নোটের মধ্যে অন্তত একটি এআই কনটেন্টবিষয়ক, যা ২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি।
আগের সংঘাতগুলোর তুলনায় এই যুদ্ধের ভুল তথ্যের ছড়াছড়ি কেন এত বেশি, তার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, উন্নত প্রযুক্তি ও চ্যাটবট। এআই এখন অনেক বেশি নিখুঁত। এমনকি এক্সের নিজস্ব চ্যাটবট ‘গ্রোক’ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর আসল ভিডিওকে ডিপফেক বলে ভুল চিহ্নিত করে বিভ্রান্তি বাড়িয়েছে।
দ্বিতীয়ত, এআই কনটেন্ট চিহ্নিতকরণ সংকট। এআই কনটেন্ট চেনার টুলগুলো এখনো শতভাগ নির্ভুল নয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে আসল ছবিকেও ‘এআই’ বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। গবেষকেরা বিষয়টিকে ‘লায়ারস ডিভিডেন্ড’, যা সত্য নির্ধারণকে অসম্ভব করে তুলছে।
তৃতীয়ত, মডারেশনের সীমাবদ্ধতা। মেটা বা এক্সের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এখন নিজস্ব কর্মীদের বদলে সাধারণ ব্যবহারকারীদের ওপর মডারেশনের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছে। সংকটের সময় এই ‘ক্রাউড’ বা সাধারণ মানুষ এআইয়ের সূক্ষ্ম কারচুপি ধরার মতো দক্ষ নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তুলনায় সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকা ইরানের জন্য এআই এখন একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা অস্ত্র। ইরান এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কিছু লক্ষ্য অর্জন করতে চাইছে। এর মধ্যে রয়েছে শক্তির প্রদর্শন। বানোয়াট ভিডিওর মাধ্যমে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস বা তেল আবিবে বিশাল বিস্ফোরণের দৃশ্য ছড়িয়ে দিয়ে নিজেদের সামরিক সামর্থ্য বাড়িয়ে দেখাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিভাজন সৃষ্টির চেষ্টা করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সমর্থকদের মধ্যে যুদ্ধের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করা এবং যুদ্ধের খরচ ও ক্ষয়ক্ষতি বাড়িয়ে দেখিয়ে জনমনে অসন্তোষ তৈরি করার চেষ্টা করছে।
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে (বিশেষ করে এক্স) ভিউ বা ইমপ্রেশনের ওপর ভিত্তি করে অর্থ উপার্জনের পথ খোলা থাকায় ব্যবহারকারীরা ভাইরাল হওয়ার নেশায় সস্তা এবং উত্তেজক এআই ভিডিও তৈরি করছে। সংঘাতের প্রথম দুই সপ্তাহে এই ধরনের ভিডিও কোটি কোটি ভিউ পেয়েছে, যা বিভ্রান্তিকর তথ্যের সরবরাহকে আরও উসকে দিয়েছে।
ইরান সংঘাত প্রমাণ করেছে, এআই এখন আর কেবল মজার কোনো প্রযুক্তি নয়, বরং এটি যুদ্ধের ময়দানে জনমত গঠন এবং শত্রুপক্ষকে মানসিকভাবে দুর্বল করার এক বিধ্বংসী হাতিয়ার। এই ‘ইনফরমেশন লেয়ারিং’ সমস্যার কারণে ভবিষ্যতে যুদ্ধের ময়দানে জেতা যতটা কঠিন হবে, তথ্যের দুনিয়ায় সত্যকে বাঁচিয়ে রাখা হবে তার চেয়েও বেশি চ্যালেঞ্জিং।
তথ্যসূত্র: ব্রুকিংস