২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের জেন-জি বিপ্লবের তরুণ নেতারা জাতীয় নাগরিক পার্টি—এনসিপি প্রতিষ্ঠা করেন। ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন এই গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটে। নতুন দলটির প্রধান লক্ষ্য ছিল তরুণ নেতৃত্বকে সংসদে নিয়ে যাওয়া এবং আন্দোলনের শক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতিতে রূপ দেওয়া।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে উদারপন্থী, বামপন্থী, ইসলামপন্থী ও জাতীয়তাবাদীদের বিস্তৃত জোট ছিল। পরে এই জোটের মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সবচেয়ে সংগঠিত শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। শেখ হাসিনার সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল এই দলটি। হাসিনাবিরোধী আন্দোলন ছিল প্রবলভাবে প্রতীক ভাঙা বা আইকনোক্লাস্টিক। বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে যুক্ত কিছু প্রতীক এবং শেখ হাসিনার বাবা শেখ মুজিবের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে তৈরি প্রতীকগুলো আক্রমণের মুখে পড়ে।
২০২৪ সালের আন্দোলনের তরুণ নেতারা যখন তাদের বিপ্লবকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে রাজনৈতিক দল গঠনের সিদ্ধান্ত নেন, তখনই ভেতরে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। এনসিপিতে প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ, রক্ষণশীল ও জাতীয়তাবাদী—এমন অস্থির ও বৈচিত্র্যময় এক মিশ্রণ ছিল। দলীয় বৈঠকগুলোতে তীব্র বিতর্ক হতো। কিন্তু কোনো সুসংহত ঐকমত্য তৈরি হয়নি। এর বদলে একটি দুর্বল ও অস্পষ্ট ভিত্তিপ্রস্তাব পেশ করা হয়। সেখানে বলা হয়, দলটি না ধর্মনিরপেক্ষ, না ইসলামপন্থী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এটিকে রাজনৈতিক দ্ব্যর্থতার ফল বলে সমালোচনা করেন। এই অস্পষ্টতা বিশেষভাবে প্রকাশ পায় দলটির গঠনতন্ত্র রচনার সময়। নেতৃত্ব ধর্মনিরপেক্ষ অংশের আকাঙ্ক্ষা এবং ক্রমবর্ধমান ইসলামপন্থী প্রভাবের মধ্যে সমন্বয় করতে হিমশিম খায়। রাষ্ট্রে ধর্মের ভূমিকা কী হবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ না করে দলটি এমন ঝুঁকি নেয়, যাতে যে কোনো সংগঠিত গোষ্ঠী, যারা রাজপথে মানুষকে সংগঠিত করতে পারে, তারা দলটিকে নিজেদের বাহন হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এর ফলেই নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির বিতর্কিত জোট গড়ে ওঠে।
উন্নয়নশীল অনেক দেশে এ ধরনের ধারা দেখা যায়। ছোট প্রগতিশীল গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই অধিক সংগঠিত ডানপন্থী শক্তির সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করে। তারা বিশ্বাস করে, ডানপন্থী দলের শক্তিশালী সাংগঠনিক যন্ত্র ব্যবহার করে ক্ষমতার করিডরে প্রবেশের একটি বাস্তবসম্মত পথ তৈরি করা যাবে।
কিন্তু ইতিহাস বলছে, এ ধরনের জোট প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিপর্যয় ডেকে আনে। এই ব্যবস্থায় ছোট প্রগতিশীল অংশগুলো শেষ পর্যন্ত আদর্শিকভাবে ফাঁপা হয়ে পড়ে বা সম্পদ ও কাঠামোগত শক্তিতে এগিয়ে থাকা ডানপন্থী ‘অংশীদারদের’ হাতে একপাশে চাপা পড়ে। জামায়াতের জনসমাবেশ সংগঠনের ক্ষমতাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে গিয়ে এনসিপি নিজেদের তরুণ সংস্কারবাদী পরিচয় ক্ষুণ্ন করে। এতে দলের ভেতরে গুরুতর ভাঙন সৃষ্টি হয়।
১৯৭৭ সালের পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন এবং তার পরবর্তী ভুট্টোবিরোধী আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সে সময় কয়েকটি ছোট ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল দল একটি জোটে যোগ দেয়, যার নেতৃত্বে ছিল দেশের তিনটি প্রধান ইসলামপন্থী দল। জোটটি জুলফিকার আলী ভুট্টোর সরকারকে স্বৈরাচারী মনে করত। কিন্তু যখন তাদের ইসলামপন্থী মিত্ররা ভুট্টোর ‘সমাজতান্ত্রিক’ নীতির পরিবর্তে শরিয়াভিত্তিক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি তোলে, তখন জোটের প্রগতিশীল অংশ প্রায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
পরে প্রতিক্রিয়াশীল এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ভুট্টোর সরকার উৎখাত হয়। তখন জোটের প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ অংশের নেতারা কারাগারে যান বা নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন। বিপরীতে, জোটের বড় অংশীদার জামায়াতে ইসলামী নতুন সামরিক সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভায় সফলভাবে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করে।
১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব এই অনিশ্চিত গতিশীলতার আরেকটি সুস্পষ্ট উদাহরণ। সত্তরের দশকের শেষ দিকে ইরানে ধর্মনিরপেক্ষ উদারপন্থী, বামপন্থী ও ছাত্রনেতারা আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বাধীন ধর্মীয় আলেমদের সঙ্গে মিলে শাহ-বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলেন।
ইরানি-আমেরিকান ইতিহাসবিদ এরভান্দ আব্রাহামিয়ানের মতে, মধ্যবিত্ত প্রগতিশীলরা ধারণা করেছিলেন যে—তাঁরা যেহেতু আন্দোলনের ‘বুদ্ধিবৃত্তিক ইঞ্জিন’, তাই বিপ্লব পরবর্তী রাষ্ট্রের কাঠামো তাঁরাই নির্ধারণ করবেন। কিন্তু শাহ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সংগঠিত ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলো দ্রুত কর্তৃত্ব কুক্ষিগত করে। এরপর তাদের সাবেক ধর্মনিরপেক্ষ ও বামপন্থী অংশীদারদের ওপর পরিকল্পিত ও নির্মম শুদ্ধি অভিযান চালানো হয়।
২০১১ সালে হোসনি মুবারককে ক্ষমতা থেকে সরানোর পর মিসরেও একই ধারা দেখা যায়। সমাজবিজ্ঞানী হাজেম কানদিল লিখেছেন, আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারপন্থী কর্মীদের এমন কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক কাঠামো ছিল না, যার মাধ্যমে তারা রাজপথের উপস্থিতিকে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতায় রূপ দিতে পারতেন। তাঁরা কৌশলগতভাবে ইসলামপন্থী মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে জোটে যান।
যদিও পরবর্তী নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুড জয়ী হয়, প্রগতিশীল তরুণদের সঙ্গে তাঁদের জোট দ্রুত ভেঙে পড়ে। প্রগতিশীলরা অভিযোগ করেন, ব্রাদারহুড সংকীর্ণ আদর্শিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য বিপ্লবকে ‘হাইজ্যাক’ করেছে। এই অভ্যন্তরীণ ভাঙনই শেষ পর্যন্ত ২০১৩ সালে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের পরিবেশ তৈরি করে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সংসদ নির্বাচনে এনসিপি মাত্র ৬টি আসন পেয়েছে। নির্বাচনে জয়ী হয়েছে মধ্যপন্থী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এনসিপির ভেতরের সমালোচকেরা মনে করেন, ইসলামপন্থী দলের সঙ্গে জোট করার সিদ্ধান্তে তাঁদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সমর্থক বিমুখ হয়েছেন। তাঁরা ভোট দিয়েছেন ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের বিরোধী শক্তি বিএনপিকে।
প্রগতিশীল বা বামপন্থীরা আন্দোলনের সময় ক্ষোভ ও অভিযোগ সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরতে এবং গণমাধ্যমের বয়ান প্রভাবিত করতে ভূমিকা রাখেন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখতে যে সামাজিক ও সাংগঠনিক শক্তি ও ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন, তা তাদের থাকে না। তারা ‘কৌশলগত অনুপ্রবেশ’ বা ট্যাকটিক্যাল এন্ট্রিজমের পথ নেয়। তারা মনে করে, বড় ডানপন্থী দলের সঙ্গে জোট করে তাদের ভৌত ও সাংগঠনিক শক্তি ব্যবহার করে ক্ষমতার অংশীদার হওয়া যাবে, এরপর ধীরে ধীরে সরকারকে সংস্কারের দিকে নেওয়া সম্ভব হবে।
কিন্তু এ ধরনের পদক্ষেপ প্রায়ই ব্যর্থ হয়। ডানপন্থী দলগুলো সাধারণত কঠোর স্তর বিন্যস্ত এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ। ফলে তারা পরে ঢিলেঢালা সংগঠিত প্রগতিশীল ‘মিত্রদের’ সহজেই ছেঁটে ফেলতে পারে। পাকিস্তানে তেহরিক-ই-তাহাফুজ-ই-আইন-ই-পাকিস্তান (টিটিএপি) নামের বিরোধী জোটে এমন এক ধরনের ‘এন্ট্রিজমের’ উদাহরণ দেখা যাচ্ছে। এই জোটের নেতৃত্বে আছে মধ্য–ডানপন্থী পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। এতে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী, ধর্মনিরপেক্ষ, রক্ষণশীল এবং একটি বামপন্থী দল একসঙ্গে রয়েছে।
এই জোটের বাম অংশ পিটিআইকে ডানপন্থী দল হিসেবে দেখতে চায় না। তারা এটিকে ‘গণতন্ত্রের’ বাহন হিসেবে বিবেচনা করছে এবং ভবিষ্যৎ পার্লামেন্টে নিজেদের প্রবেশের একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে। হয়তো তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এও যে, বিশৃঙ্খল অবস্থায় থাকা পিটিআইকে একসময় সরিয়ে দিয়ে তারা নিজেরাই সেই শূন্যস্থান পূরণ করবে, যেন ভেঙে পড়া জাহাজ দখল করেই জনগণের নেতৃত্ব নেওয়া যায়।
নিজেদের ঘোষিত মূল্যবোধের পরিপন্থী অবস্থানকে যুক্তিসংগত প্রমাণ করতে যে বুদ্ধিবৃত্তিক নমনীয়তা প্রয়োজন, তা বিস্ময়কর। বিশেষ করে, ডানপন্থী উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে কোনো অর্থবহ পদক্ষেপ নিতে পিটিআইয়ের অনড় অস্বীকৃতিকে উপেক্ষা করার ক্ষেত্রে। এটি যেন নৈতিক স্মৃতিভ্রংশের এক পাঠ।
এদিকে জোটের অভিজ্ঞ সদস্যরা, যারা আগে পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) সমর্থক ছিলেন, তাঁরা এই জনতার বাহনকে এক ধরনের দীর্ঘ রাজনৈতিক অডিশন হিসেবে দেখছেন। তাঁদের লক্ষ্য দেশের আত্মাকে রক্ষা করা নয়। বরং ক্ষমতাকাঠামোর কাছে নিজেদের উপস্থাপন করা। আশা, পরবর্তী ‘কিংস পার্টি’র নেতৃত্বের ভূমিকায় তাদের বেছে নেওয়া হবে।
সবশেষে, পুরো ঘটনাপ্রবাহটি প্রকৃত অর্থে ‘গণতন্ত্রের সংগ্রাম’ বা ‘সংবিধানের পবিত্রতা রক্ষার লড়াই’-এর চেয়ে অনেক বেশি এক অন্ধকার রাজনৈতিক প্রহসনের উপাদান জোগায়।
পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক দ্য ডন-এ প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে অনূদিত