যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ বন্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের জয় ও ভূরাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করতে নেমেছে বেইজিং। গত ফেব্রুয়ারির শেষে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যখন বোমা হামলা শুরু হয়েছিল, তখন ভেনেজুয়েলার মতো আরেকটি মিত্র সরকারের পতনের আশঙ্কায় ছিল চীন। তবে চার মাস পর চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও ইরানের শাসনব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রয়েছে, যা বিশ্বমঞ্চে মার্কিন ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে প্রকাশ করেছে।
চীন এই পুরো সংকটে অত্যন্ত চতুর ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক পথ অনুসরণ করেছে। একদিকে তারা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইরানি তেল কেনা বজায় রেখেছে। অন্যদিকে দুই পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগের পথ খোলা রেখেছে। এমনকি মার্কিন নৌ-অবরোধ অমান্য করতে চীন তার নৌবাহিনী ব্যবহার না করায় গত বুধবার ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমি চীন ও প্রেসিডেন্ট সিকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। তিনি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ছিলেন এবং এই সংকটের সমাধানে সাহায্য করেছেন।’
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বেইজিং এখন সম্পূর্ণ প্রস্তুত। এ ছাড়া গত এপ্রিলে সি চিনপিংয়ের দেওয়া ‘চার দফা শান্তি প্রস্তাব’-এর ধারাবাহিকতায় এই যুদ্ধ বন্ধে চীন নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়েছে।
চীনের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এই যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ১৯৫০-এর দশকের ব্রিটেনের ‘সুয়েজ সংকট’-এর মতো একটি মুহূর্ত বা আন্তর্জাতিক পতনের সূচক হিসেবে দেখছেন। সাংহাইয়ের ফুদান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সুন দেগাং গ্লোবাল টাইমসে লিখেছেন, ‘স্নায়ু যুদ্ধের পর আমেরিকা ছিল একমাত্র পরাশক্তি। কিন্তু এবার মার্কিন সামরিক শক্তি ওয়াশিংটনের ভাবনামতো অতটা অপ্রতিরোধ্য প্রমাণিত হয়নি। উপরন্তু, প্রধান মিত্রদের পাশে না পাওয়া প্রমাণ করে যে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক জোটে ফাটল ধরছে।’
অন্যদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষক হু সিজিন মনে করেন, এই যুদ্ধ তাইওয়ান ইস্যুতে আমেরিকার প্রতিরোধ ক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধে মার্কিন অস্ত্রভান্ডারের সীমাবদ্ধতা এবং একটি বিচ্ছিন্ন দেশের বিরুদ্ধেও পশ্চিমা জোট গঠনে ওয়াশিংটনের ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে, ইউরোপীয় মিত্রদের চীনের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলার মতো কোনো লিভারেজ এখন আর আমেরিকার হাতে নেই।’
গত বুধবার ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে চূড়ান্ত চুক্তি সম্পাদনের জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে চীন কেন ইরান পুনর্গঠনে এত মরিয়া, তার প্রধান কারণগুলো হলো—
জ্বালানি নিরাপত্তা: যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট চীন তার বিশাল কৌশলগত তেল মজুত এবং গ্রিন টেকনোলজির মাধ্যমে ভালোভাবেই সামাল দিয়েছে। ইরান পুনর্গঠনে অংশ নিয়ে বেইজিং দীর্ঘ মেয়াদে দেশটির জ্বালানি খাতের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
পরাশক্তি হিসেবে আস্থার প্রতীক: বেইজিং প্রমাণ করতে চায় যে, পশ্চিমা বিশ্ব যখন যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়, তখন চীন শান্তি ও উন্নয়নের বার্তা নিয়ে আসে।
নতুন বিশ্বব্যবস্থা: চীন দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার আধিপত্যহীন একটি ‘বহুমুখী বিশ্ব’ প্রতিষ্ঠার পক্ষে সওয়াল করছে। ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে নিজের ওপর নির্ভরশীল করে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভার খর্ব করা চীনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
বেইজিংয়ের শীর্ষ কূটনীতিক ওয়াং ই ইতিমধ্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে ফোনালাপে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, শান্তি চুক্তির পরবর্তী ধাপে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং সব পক্ষকে তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চীনের বৈশ্বিক নেতৃত্ব নিশ্চিত করে না। বরং বেইজিংকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা শুধু সমালোচনা নয়, বাস্তবসম্মত কূটনৈতিক সমাধান, জ্বালানি স্থিতিশীলতা এবং উত্তেজনা প্রশমনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
বেইজিংভিত্তিক সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সুন চেংহাও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র এখনো সবচেয়ে শক্তিশালী বহিরাগত শক্তি। তবে সেই প্রভাব ধরে রাখতে তাদের এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হবে। আর এই সুযোগে সহজেই মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে পারে চীন।