ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক গণভোটের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। এই দ্বিমুখী রায়ে একদিকে যেমন সংসদের ক্ষমতার বিন্যাস নির্ধারিত হয়েছে, অন্যদিকে দেশের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র ও সাংবিধানিক সংস্কারের প্রশ্নে জনমত স্পষ্ট হয়েছে।
গণভোটের রায়: ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয়জয়কার
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে অনুষ্ঠিত গণভোটে দেশের মানুষ অভূতপূর্ব সাড়া দিয়েছে। ২৯৭টি আসনের চূড়ান্ত ফলাফল অনুযায়ী:
‘হ্যাঁ’ ভোট: ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি।
‘না’ ভোট: ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি।
বাতিল ভোট: ৭৪ লাখ ২ হাজার ২৮৫টি।
ভোট প্রদানের হার: ৬০.২৬ শতাংশ।
নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, এই রায়ের ফলে ‘জুলাই সনদ’-এর ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে আগামী সংসদ আইনত বাধ্য থাকবে।
উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ কয়েকটি সীমিত এলাকায় ‘না’ ভোট বেশি পড়লেও সামগ্রিক জাতীয় রায়ে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েছে।
সংসদের চিত্র: একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিএনপি
ত্রয়োদশ সংসদের ২৯৭টি আসনের বেসরকারি ফলাফলে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।
বিএনপি: ২০৯টি আসন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী: ৬৮টি আসন।
জোটগত অবস্থান: বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি।
অন্যান্য দল: এনসিপি (৬), বিকেএম (২), খেলাফত মজলিশ (১), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (১), গণঅধিকার পরিষদ (১), বিজেপি (১) এবং গণসংহতি আন্দোলন (১)।
জুলাই সনদ: ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের ব্যবচ্ছেদ
জুলাই সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে, যার মধ্যে ৪৭টি সাংবিধানিক এবং ৩৭টি সাধারণ আইন বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. পরিচয় ও ভাষার স্বীকৃতি
বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানে বাংলা ছাড়া অন্য ভাষার স্বীকৃতি নেই। তবে জুলাই সনদে বলা হয়েছে- প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা। অন্যসব মাতৃভাষাকেও স্বীকৃতি দেওয়া হবে। বাংলাদেশের নাগরিকেরা এতদিন বাঙালি জাতি হিসেবে পরিচিত হলেও সংস্কারের পর পরিচয় হবে বাংলাদেশি।
২. সংবিধান সংশোধন
বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদের দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগে, প্রয়োজন নেই গণভোটেরও। তবে জুলাই সনদে বলা হয়েছে- সংবিধান সংশোধনে সংসদের নিম্নকক্ষে দুই তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। অন্যদিকে সংবিধানের প্রস্তাবনা- ৮, ৪৮, ৫৬ এবং ১৪২ অনুচ্ছেদ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তনে গণভোট লাগবে।
বর্তমান সংবিধানে ৭ এর ক ও খ অনুযায়ী সংবিধান রহিত করলে, সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান ছিল, জুলাই সনদে সেটি বিলুপ্ত করা হয়েছে।
৩. মূলনীতি
বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ বর্তমান সংবিধানের মূলনীতি। তবে গণভোটে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে সংবিধানের মূলনীতি হবে– সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সম্প্রীতি।
বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। জুলাই সনদে সেই অনুচ্ছেদ যুক্ত হবে- সকল সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে।
৪. মৌলিক অধিকার
সংবিধানে বর্তমানে ২২টি মৌলিক অধিকার রয়েছে। তবে জুলাই সনদে যুক্ত করা হয়েছে- নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার বিষয়টি।
৫. জরুরি অবস্থা
বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী জরুরি অবস্থা জারি হয় প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরে। এর ফলে মৌলিক অধিকার স্থগিত হয়। সনদে নতুন যে প্রস্তাবনা আনা হয়েছে তাতে বলা হয়েছে- জরুরি অবস্থা জারি করতে হলে মন্ত্রিসভার অনুমোদন লাগবে। সেই সভায় বিরোধী দলীয় নেতা/উপনেতাও উপস্থিত থাকতে হবে। অন্যদিকে, জরুরি অবস্থার সময় সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৌলিক অধিকারসমূহ খর্ব করা যাবে না।
৬. রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও ক্ষমতা
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয় সংসদ সদস্যদের ভোটে। এই ভোট দিতে হয় প্রকাশ্যে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে গোপন ব্যালটে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হবেন রাষ্ট্রপতি।
রাষ্ট্রপতি তাঁর নিজ ক্ষমতায় প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে পারেন বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পর প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান এবং সদস্য নিয়োগ করতে পারবেন রাষ্ট্রপতি। যদিও এই প্রস্তাবে ভিন্নমত ছিল বিএনপির।
৭. রাষ্ট্রপতির অভিশংসন
রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করতে দুই তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের ভোটের প্রয়োজন হয়। জুলাই সনদে সেখানে সংসদের উভয় কক্ষের বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ দুই কক্ষের দুই তৃতীয়াংশের ভোটে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যাবে।
৮. রাষ্ট্রপতির ক্ষমা
আগে সরকারের অনুমোদনে যে কোন অপরাধীকে ক্ষমা করতে পারতেন রাষ্ট্রপতি। জুলাই সনদে বলা হয়েছে- শুধু ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা পরিবার সম্মতি দিলে অপরাধীকে ক্ষমা করতে পারবেন রাষ্ট্রপতি।
৯. প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদ
২০০৮ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চারবার শপথ নিয়েছিলেন ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা। বিদ্যমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদ ছিল না। তবে জুলাই সনদে বলা হয়েছে- এক ব্যক্তি এক জীবনে ১০ বছরের বেশি অর্থাৎ দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।
অন্যদিকে, বর্তমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রী একাধিক পদে থাকতে পারেন। তবে জুলাই সনদে বাস্তবায়ন হলে একাধিক পদে থাকতে পারবেন না প্রধানমন্ত্রী। যদিও এই বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত জানিয়েছিল বিএনপিসহ পাঁচটি দল।
১০. তত্ত্বাবধায়ক সরকার
বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নেই। জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যুক্ত করার পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান উপদেষ্টাসহ এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারি দল, বিরোধীদল, দ্বিতীয় বিরোধীদলের মতামতের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হবে।
১১. দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ
স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে বাংলাদেশের সংসদ এক কক্ষ বিশিষ্ট থাকলেও এবার জুলাই সনদে সেটি দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের সদস্য সংখ্যা হবে ১০০ জন। এক্ষেত্রে সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারেই উচ্চকক্ষে আসন বণ্টন করা হবে।
১২. সংসদে নারী
দেশের জাতীয় সংসদে বর্তমানে নারীদের সংরক্ষিত আসন রয়েছে ৫০টি। এটি বাড়ানোর কোনো কথা বলা নেই বিদ্যমান সংবিধানে। সেটি ক্রমান্বয়ে ১০০তে উন্নীত করা এবং সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে আসার সুযোগ করে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে জুলাই সনদে।
১৩. স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার
সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার সরকারি দল থেকেই নির্বাচিত হয়ে থাকেন। গণভোটে সনদ কার্যকর হলে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন বিরোধী দল থেকে।
১৪. সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, সংসদে এমপিরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়। তবে, জুলাই সনদে বলা হয়েছে- বাজেট ও আস্থাবিল ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে এমপিরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন।
১৫. বিদেশি চুক্তিতে সংসদের অনুমোদন
এতদিন বিদেশের সঙ্গে সরকারের কোনো চুক্তি করতে হলে সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন হতো না। তবে জুলাই সনদে বলা হয়েছে- রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো চুক্তি করতে হলে সংসদের উভয় কক্ষে তা অনুমোদন করতে হবে।
সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণে এতদিন নির্বাচন কমিশনের একক কর্তৃত্ব থাকলেও গণভোটে জুলাই সনদে ইসির একক কর্তৃত্ব না রাখার কথা বলা হয়েছে। ইসির সঙ্গে বিশেষজ্ঞ কমিটিও এই দায়িত্ব পালন করবে।
১৬. নির্বাচন কমিশন গঠন
এর আগে নানা নির্বাচন কমিশন গঠনে সার্চ কমিটি থাকলেও এর নিয়ন্ত্রণ ছিল পুরোপুরি প্রধানমন্ত্রীর হাতে। জুলাই সনদে বলা হয়েছে- স্পিকারের সভাপতিত্বে বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা এবং আপিল বিভাগের বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে।
১৭. প্রধান বিচারপতি নিয়োগ
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হবে। সংবিধানের এই অনুচ্ছেদে বলা আছে রাষ্ট্রপতি যে কাউকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে পারেন। তবে, জুলাই সনদের এই অংশে বলা হয়েছে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে আপিল বিভাগ থেকে।
১৮. আপিল বিভাগের বিচারক সংখ্যা
আপিল বিভাগের বিচারক সংখ্যা সরকার নির্ধারণ করার কথা আছে বিদ্যমান সংবিধানে। তবে জুলাই সনদে বলা হয়েছে প্রধান বিচারপতির চাহিদার ভিত্তিতে বিচারকের সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে। আগে হাইকোর্টের বিচারক নিয়োগ প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণেও থাকলেও জুলাই সনদে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিশনের হাতে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
১৯. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
এ ছাড়া বিচার বিভাগকে পূর্ণ স্বাধীনতার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা দেওয়া, প্রত্যেক বিভাগে হাইকোর্টের এক বা একাধিক বেঞ্চ স্থাপন, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে শক্তিশালী করা, নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টে ন্যস্ত করার মতো বিষয়গুলো যুক্ত করা হয়েছে জুলাই সনদে।
২০. ন্যায়পাল ও অন্যান্য পদে নিয়োগ
এর আগে সংবিধানে থাকলেও কখনো ন্যায়পাল নিয়োগ হয়নি। জুলাই সনদে বলা হয়েছে- স্পিকারের সভাপতিত্বে বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা, দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের প্রতিনিধি, রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি এবং আপিল বিভাগের বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত সাত সদস্যের কমিটির মাধ্যমে ন্যায়পাল নিয়োগ হবে।
একইভাবে সরকারি কর্মকমিশন নিয়োগ, মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক নিয়োগ, দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ বিরোধী দলের সমন্বয়ে আলাদা আলাদা কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে জুলাই সনদে। যদিও এগুলো নোট অব ডিসেন্ট বা আপত্তি জানিয়েছে বিএনপিসহ সাতটি দল।
সাংবিধানিক ক্ষমতার অপব্যবহার রোধের ব্যবস্থা বিদ্যমান আইনে না থাকলেও জুলাই সনদে তা যুক্ত করা হয়েছে।
৪৭টি সাংবিধানিক সংস্কারের বাইরে আর যে ৩৭টি সংস্কার প্রস্তাব আছে জুলাই সনদে সেগুলো সংশোধন করা যাবে ’আইন/অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে।
আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সংসদের কমিটিসমূহ ও সদস্যদের বিশেষ অধিকার, অধিকারের সীমা এবং দায় নির্ধারণের অঙ্গীকার থাকছে জুলাই সনদে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সীমানা পুনঃনির্ধারণে আইন প্রণয়ন, বিচারকদের জন্য অবশ্য পালনীয় আচরণবিধি, সাবেক বিচারপতিদের জন্য অবশ্য পালনীয় আচরণবিধি, সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, স্বতন্ত্র ফৌজদারি তদন্ত সার্ভিস গঠন, বিচার বিভাগের জনবল বৃদ্ধি, জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থাকে অধিদপ্তরে রূপান্তর, বিচারক ও সহায়ক কর্মচারীদের সম্পত্তির বিবরণ, আদালত ব্যবস্থাপনা সংস্কার ও ডিজিটালাইজ করা, আইনজীবীদের আচরণবিধি সংক্রান্ত বিষয় রাখা হয়েছে ’আইন/অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংস্কারের জন্য।
এ ছাড়া জনপ্রশাসন সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি স্বাধীন ও স্থায়ী জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন, প্রজাতন্ত্রের কর্মে জনবল নিয়োগের জন্য সরকারি কর্ম কমিশন (সাধারণ), সরকারি কর্ম কমিশন (শিক্ষা) এবং সরকারি কর্ম কমিশন (স্বাস্থ্য) গঠন করার কথা বলা হয়েছে জুলাই সনদে।
অন্যদিকে, ভৌগোলিক অবস্থান ও যাতায়াতের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে দুটি প্রশাসনিক বিভাগ গঠন করার কথাও বলা হয়েছে জুলাই সনদে।
তবে গণভোটের ব্যালটে এসব কিছু বিস্তারিত লেখা ছিল না। সেখানে মোট চারটি বিষয়ের উল্লেখ করে হ্যাঁ/না ভোট দিতে বলা হয়েছে।
গণভোটের বিষয়
প্রশ্ন: ’জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি ভোটারগণ সম্মতি জ্ঞাপন করেন কি না (হ্যাঁ/না) সেই বিষয়ে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
ক. নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।
খ. আগামী জাতীয় সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।
গ. সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল হতে ডেপুটি স্পীকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হয়েছে- সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকবে।’
ঘ. জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত (Note of Dissent)
জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হলেও কয়েকটি বিষয়ে প্রধান দলগুলোর ভিন্নমত ছিল:
বিএনপির আপত্তি: প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা খর্ব করে রাষ্ট্রপতির এককভাবে নিয়োগ প্রদানের কিছু বিষয়ে বিএনপি ভিন্নমত পোষণ করেছে। এ ছাড়া উচ্চকক্ষ গঠন প্রক্রিয়া, ন্যায়পাল ও অন্যান্য সাংবিধানিক পদে নিয়োগের কমিটির কাঠামো নিয়েও তাদের নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে।
জামায়াত ও অন্যান্য দল: আনুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি এবং উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন নিয়ে জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দলের নিজস্ব প্রস্তাব ছিল।
আগামী দিনের পথনকশা
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন। তাঁরা পরবর্তী ১৮০ দিন বা ৬ মাসের মধ্যে জুলাই সনদ অনুযায়ী সাংবিধানিক সংশোধনী সম্পন্ন করতে বাধ্য থাকবেন। এই সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানের ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত হবে।