একসময় প্রযুক্তি খাতের চাকরিতে টিকে থাকতে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের বলা হতো, ‘কোডিং শিখুন।’ কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে সেই সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন বিশ্বের বড় বড় এআই গবেষণাগার ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো দার্শনিকদের খুঁজছে। কারণ, এআই এমন সব জটিল নৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশ্ন তৈরি করছে, যেগুলোর উত্তর খুঁজতে দর্শনের প্রয়োজন পড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দর্শনে স্নাতক তরুণদের কর্মসংস্থানের হার এখন কম্পিউটার বিজ্ঞানের স্নাতকদের চেয়েও বেশি। ২০২৪ সালে কম্পিউটার বিজ্ঞানে পড়াশোনা করা ব্যক্তিদের বেকারত্বের হার ছিল ৭ শতাংশ, যেখানে দর্শনের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে তা ছিল মাত্র ৫ দশমিক ১ শতাংশ। অনেক দার্শনিককে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরাসরি এআই কোম্পানিগুলো নিয়োগ দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দর্শনের বহু পুরোনো ধারণা আধুনিক এআই উন্নয়নে নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের প্রশ্নভিত্তিক শিক্ষাপদ্ধতি বা ‘সক্রেটিক মেথড’ তার অন্যতম উদাহরণ। এই পদ্ধতি ধারাবাহিক প্রশ্নের মাধ্যমে যুক্তির অসংগতি চিহ্নিত করে এবং সত্যের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করে। গবেষকদের মতে, এই ধরনের প্রশিক্ষণ এআইকে শুধু ব্যবহারকারীকে খুশি করার প্রবণতা থেকে দূরে রেখে সত্য অনুসন্ধানে বেশি মনোযোগী করতে পারে।
এ ছাড়া ‘আমি কত কম জানি, তা জানি’—সক্রেটিসের এই বিনয়ী দৃষ্টিভঙ্গিও এআই উন্নয়নে ব্যবহৃত হচ্ছে। কারণ, অনেক সময় এআই মডেল অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল তথ্য দেয়, যাকে বলা হয় ‘হ্যালুসিনেশন’। গুগল ডিপমাইন্ডের দার্শনিক গবেষক ইয়াসন গ্যাব্রিয়েলের মতে, এই ধরনের দর্শনভিত্তিক চিন্তাভাবনা এআইয়ের ভুল তথ্য দেওয়ার প্রবণতা কমাতে সহায়তা করছে।
দর্শনের প্রভাব শুধু যুক্তি বা জ্ঞানতত্ত্বে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন এআই মডেলকে নির্দিষ্ট নৈতিক বা রাজনৈতিক চিন্তার কাঠামোও দেওয়া হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ জন লকের দর্শনভিত্তিক প্রশিক্ষণ পাওয়া একটি আইনি সহকারী ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকারের পক্ষে বেশি ঝুঁকতে পারে। আইবিএমের ‘গ্রানাইট’ সিরিজের মডেলগুলো এমনকি ব্যবহারকারীদের নিজস্ব করপোরেট মূল্যবোধ অনুযায়ী উত্তর সামঞ্জস্য করার সুযোগও দেয়।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও দর্শনের ভূমিকা বাড়ছে। গবেষকেরা ইতিমধ্যে এমন কিছু এআই আচরণ শনাক্ত করেছেন, যেখানে মডেল নজরদারি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে বা ব্যবহারকারীকে প্রভাবিত করার প্রবণতা দেখিয়েছে। এসব ঝুঁকি কমাতে অনেক প্রতিষ্ঠান ‘এআই কনস্টিটিউশনালিজম’ পদ্ধতি গ্রহণ করছে। এতে নৈতিক ও আইনি নীতিমালার ভিত্তিতে এআইয়ের জন্য একধরনের আচরণবিধি তৈরি করা হয়।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হলো অ্যানথ্রপিক। তাদের ক্লদ (Claude) মডেলের জন্য তৈরি ‘সংবিধান’-এ জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের চিন্তাধারা, মানবাধিকার ঘোষণাপত্র এবং বিভিন্ন নীতিগত নির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা মজা করে একে ক্লদের ‘সোল ডক’ বা আত্মার দলিলও বলে থাকেন।
এআই নৈতিকতায় বর্তমানে দুটি প্রধান দর্শনীয় ধারা সবচেয়ে বেশি আলোচিত। প্রথমটি হলো ‘ডিওনটোলজি’, যা কিছু নীতিকে পরিস্থিতি যা হোক না কেন, অপরিবর্তনীয় বলে মনে করে। মিথ্যা বলা বা মানুষকে কেবল একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা এই দৃষ্টিভঙ্গিতে গ্রহণযোগ্য নয়। অন্যদিকে ‘কনসিকোয়েনশিয়ালিজম’ বা ফলাফলবাদ সিদ্ধান্তের ফলাফল বিবেচনা করে কাজকে মূল্যায়ন করে। ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি ও গুগলের জেমিনি তুলনামূলকভাবে এই দ্বিতীয় ধারার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বচালিত গাড়ি, সামরিক প্রযুক্তি কিংবা চিকিৎসা সহায়ক এআই ব্যবস্থায় প্রায়ই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে কোন সিদ্ধান্তে সবচেয়ে কম ক্ষতি হবে, তা নির্ধারণ করতে হয়। ফলে নৈতিক দর্শনের প্রশ্নগুলো প্রযুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।
তবে সমালোচকেরা সতর্ক করছেন, যদি কম্পিউটার ক্রমেই নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করে, তাহলে মানুষ নিজের বিচারবোধ ব্যবহারে অনাগ্রহী হয়ে পড়তে পারে। তবু একটি বিষয় স্পষ্ট—এআই যত এগোচ্ছে, দর্শনের গুরুত্বও তত বাড়ছে। প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ গঠনে প্রোগ্রামারদের পাশাপাশি দার্শনিকেরাও এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
দ্য ইকোনমিস্ট অবলম্বনে