ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা বর্তমান সামরিক অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলে ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত সোমবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই মন্তব্য করেন। তবে সামরিক বিশ্লেষক ও গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ইরানের বিশাল ক্ষেপণাস্ত্রের ভান্ডার এবং তাদের উৎপাদন কেন্দ্রগুলো খুঁজে বের করে ধ্বংস করা মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর জন্য অত্যন্ত কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত শনিবার থেকে ইরানজুড়ে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামক যৌথ হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, রোববার ইরানের ‘সুরক্ষিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলোতে’ হামলার জন্য ২ হাজার পাউন্ডের বোমা এবং বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান ব্যবহার করা হয়েছে। জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন নিশ্চিত করেছেন, ইরানের এই প্রধান ঘাঁটিগুলো মাটির অনেক গভীরে অবস্থিত, যা সাধারণ বিমান হামলায় ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব।
ইরানের ‘মিসাইল সিটি’ ও সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বিমান হামলার মাধ্যমে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি এবং অস্ত্র তৈরির কৌশল ও অবকাঠামো মুছে ফেলা সম্ভব নয়। ইরান গত কয়েক দশকে পাহাড়ের গভীরে ‘মিসাইল সিটি’ বা ক্ষেপণাস্ত্রের শহর গড়ে তুলেছে। এর মধ্যে লরেস্তান প্রদেশের খোররামাবাদ এবং পূর্ব আজারবাইজানের তাবরিজ অন্যতম বড় দুটি ঘাঁটি হিসেবে চিহ্নিত।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) মিসাইল ডিফেন্স প্রজেক্টের পরিচালক টম কারাকো বলেন, ‘আকাশপথ থেকে সবকিছু ধ্বংস করা এবং তার ক্ষয়ক্ষতি সঠিকভাবে নিরূপণ করা খুবই কঠিন কাজ।’ তিনি আরও জানান, ইরানের ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলো পুরোপুরি অকেজো করতে হলে মার্কিন বা ইসরায়েলি স্পেশাল ফোর্সকে সরাসরি স্থলপথে তল্লাশিতে নামতে হতে পারে। কিন্তু এটি বড় ধরনের যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করবে।
ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও প্রক্সি যুদ্ধ
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলো খুলে ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করা যায়, অনেকটা মডুলার, যা সহজে পাচার বা লুকিয়ে রাখা সম্ভব। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পেন্টাগনের গোয়েন্দা সংস্থা (ডিআইএ) এক প্রতিবেদনে জানায়, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের কাছে পাঠানো অন্তত ১৮টি জাহাজ আটক করা হয়, যেখানে ইরানের ফাতেহ-১১০ ও শাহাব-৩-এর মতো ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ পাওয়া গেছে। এটি প্রমাণ করে, মূল স্থাপনা ধ্বংস হলেও ইরান তার প্রক্সি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম।
ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের শ্রেণিবিন্যাস ও পাল্লা:
ইরান বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডারের অধিকারী। তাদের মূল ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পাল্লা:
ক্লোজ-রেঞ্জ (সংক্ষিপ্ত পাল্লা): ফাতেহ-১১০-এর মতো ক্ষেপণাস্ত্র ৩০ থেকে ১৯০ মাইল পর্যন্ত নির্ভুলভাবে আঘাত করতে পারে।
শর্ট-রেঞ্জ (স্বল্প পাল্লা): ৩১০ থেকে ৬২০ মাইল (যেমন কিয়াম-১)।
মিডিয়াম-রেঞ্জ (মধ্যম পাল্লা): শাহাব-৩ এবং খোররামশাহর-৪-এর মতো ক্ষেপণাস্ত্র ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ মাইল দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা ইতিমধ্যে ইরানের প্রায় ২০০টি ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার (উৎক্ষেপণ কেন্দ্র বা মঞ্চ) ধ্বংস করেছে এবং অর্ধেকের বেশি মজুত ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইরানের হাতে এখনো ২ হাজার ৫০০-এর বেশি কার্যকর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে।
আইএনএফ চুক্তি ও বর্তমান অস্ত্র প্রতিযোগিতা
১৯৮৭ সালের ইন্টারমিডিয়েট-রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস (আইএনএফ) চুক্তির কারণে দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্র ৫০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পাল্লার ভূমি থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি থেকে বিরত ছিল। কিন্তু ২০১৯ সালে এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর পেন্টাগন দ্রুত প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইলের (পিআরএসএম) মতো নতুন অস্ত্র তৈরি শুরু করে। বিপরীতে ইরান কখনোই এই চুক্তির অংশ ছিল না। ফলে তারা অবাধে মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি উন্নত করতে পেরেছে।
উল্লেখ্য, আকাশ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র খুঁজে খুঁজে ধ্বংস করার মিশন পেন্টাগনের জন্য নতুন নয়। ১৯৯১ সালে অপারেশন ডেজার্ট স্টর্মের সময় ইরাকের স্কাড ক্ষেপণাস্ত্র খুঁজে বের করতে হিমশিম খেয়েছিল মার্কিন বাহিনী। সিআইএর রিপোর্ট অনুযায়ী, সেই সময় সাফল্যের হার ছিল অত্যন্ত নগণ্য। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইরানের কয়েক স্তরের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং পাহাড়ের গভীরে অবস্থিত কারখানাগুলো মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি সামরিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্যসূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস