হোম > বিশ্লেষণ

৩১ বছর পর প্রত্যক্ষ সংলাপে ইসরায়েল-লেবানন, হিজবুল্লাহকে ছাড়া কি সমাধান সম্ভব

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

লেবাননে প্রয়াত নেতা হাসান নাসরাল্লাহর ছবি নিয়ে হিজবুল্লাহ সমর্থকদের বিক্ষোভ। ছবি: এএফপি

দীর্ঘ ৩১ বছরের স্থবিরতা ভেঙে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সংলাপ শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকটিকে আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে বিবেচনা করছেন অনেকে। তবে আলোচনার টেবিলে দুই দেশের বিপরীতমুখী অবস্থান এবং লেবাননের অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর তীব্র বিরোধিতার কারণে এই সংলাপের সফল সমাপ্তি নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।

১৯৯৩ সালের পর এই প্রথম দুই প্রতিবেশী দেশ কোনো সরাসরি দ্বিপক্ষীয় সংলাপে লিপ্ত হলো। ১৯৯৩ সালের ওসলো চুক্তির সময় আলোচনার পর থেকে দুই দেশের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। এবারের এই আলোচনার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক মার্কিন-ইরান সংলাপের পর। ইরান চেয়েছিল লেবাননকে একটি ‘দর-কষাকষির ঘুঁটি’ হিসেবে ব্যবহার করতে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সরাসরি বৈরুতের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে তেহরানকে এই সমীকরণ থেকে কৌশলে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে।

দুই দেশ আলোচনার টেবিলে বসেছে ভিন্ন ভিন্ন অ্যাজেন্ডা নিয়ে:

লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এবং রাষ্ট্রদূত নাদা হামাদেহ জোর দিয়েছেন অবিলম্বে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকরের ওপর। তাঁদের প্রধান লক্ষ্য ইসরায়েলি বিমান হামলা ও স্থল অভিযান বন্ধ করে গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া মানবিক বিপর্যয় রোধ করা। লেবাননের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু লেবাননের সেনাবাহিনীর হাতে থাকাই হবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।

অপর দিকে ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লিতার এবং প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর মূল লক্ষ্য হলো হিজবুল্লাহর সামরিক শক্তি চূর্ণ করা। ইসরায়েল এটিকে ‘লেবাননের সঙ্গে যুদ্ধ নয়, বরং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করছে। তাদের দাবি, হিজবুল্লাহকে লিটানি নদীর উত্তরে সরিয়ে দেওয়া এবং তাদের অস্ত্র ভাণ্ডার ধ্বংস না করা পর্যন্ত কোনো স্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়।

ওয়াশিংটন বৈঠকের সবচেয়ে বড় কাঁটা হলো হিজবুল্লাহ। গোষ্ঠীটির প্রধান নাঈম কাসেম এবং রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য ওয়াসিক সাফা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তাঁরা ওয়াশিংটনের কোনো সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য নন। তাঁদের যুক্তিগুলো হলো:

আগুন ও আলোচনার অসংগতি: বোমাবর্ষণের মুখে আলোচনা করাকে তারা ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ মনে করে।

রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের টানাপোড়েন: লেবানন সরকার হিজবুল্লাহর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকা সত্ত্বেও তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করছে, যা গোষ্ঠীটির মতে একটি ‘প্রতারণা’।

ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক: হিজবুল্লাহ মনে করছে, এই সংলাপের মাধ্যমে তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ইরানকে পাশ কাটানো হচ্ছে।

যখন ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই বৈঠককে ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ বলছেন, তখন রণক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করছে আলোচনার গতিপথ। দক্ষিণ লেবাননের বিনত জবেইল শহরটি হিজবুল্লাহর একটি প্রতীকী এবং সামরিক শক্তিকেন্দ্র। ইসরায়েলি বাহিনী বর্তমানে এই শহরটি ঘিরে রেখেছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ইসরায়েল বিনত জবেইল দখল করতে পারে, তবে তারা নিরস্ত্রীকরণের দাবিতে আরও অনড় থাকবে। আর যদি হিজবুল্লাহ প্রতিরক্ষা দেয়াল ধরে রাখতে পারে, তবে লেবানন সরকার আলোচনার টেবিলে একটি ‘সমান অবস্থানের’ সুযোগ পাবে।

তবে গত ৪৬ দিনের লড়াইয়ে লেবাননের পরিস্থিতি শোচনীয়। ইসরায়েলি হামলা অন্তত ২ হাজার ৮৯ জন নিহত হয়েছে। যার মধ্যে ১৬৫টি শিশু এবং ৮৭ জন স্বাস্থ্যকর্মী। এ ছাড়া প্রায় ১২ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। ইসরায়েলী হামলায় দগ্ধ ও আহত রোগীদের ভিড়ে লেবাননের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়ার মুখে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই সংলাপকে একটি ‘প্রক্রিয়া’ হিসেবে অভিহিত করেছেন—যা সময়সাপেক্ষ। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, লেবানন সরকার কি আদৌ হিজবুল্লাহর ওপর তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবে? যদি হিজবুল্লাহ এই প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করার জন্য আক্রমণ আরও তীব্র করে, তবে এই কূটনৈতিক উদ্যোগ মাঝপথেই থমকে যেতে পারে।

আপাতত, দুই দেশ পরবর্তী বৈঠকের সময় ও স্থান নির্ধারণে সম্মত হয়েছে, যা ক্ষীণ হলেও একটি আশার আলো দেখাচ্ছে। কিন্তু লেবাননের সাধারণ মানুষ এবং রণক্ষেত্রের যোদ্ধাদের জন্য ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা ও বিবিসি

মার্কিন আধিপত্যের উত্থান ও পতনের ইতিহাস

নেতানিয়াহুর পতনেও ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি নিধনযজ্ঞ থামবে না

এআই ল্যাবগুলোতে দার্শনিকের চাহিদা কেন বাড়ছে

স্পেসএক্স: লাগামহীন নয়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি

যুদ্ধের পর ইরান পুনর্গঠনে কেন উঠেপড়ে লেগেছে চীন

দিল্লিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ও অজিত দোভাল বৈঠক, ছন্দে ফিরছে কি চীন-ভারত সম্পর্ক

ভূমিধস বিজয়ের দুই বছরের মাথায় কেন প্রধানমন্ত্রিত্ব ছাড়লেন স্টারমার

১০ বছরে ৬ জনের পদত্যাগ: কেন বারবার বদলাচ্ছে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী

রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা কীভাবে ভেদ করল ইউক্রেন

ভক্ত থেকে কেন হঠাৎ ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে মেলোনি