হোম > বিশ্লেষণ

সার্বিয়ার স্ট্রংম্যান ভুচিচকে যেভাবে গদিচ্যুত করলেন ছাত্ররা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

সার্বিয়ায় নির্বাচনে জয়ের পর রাজধানী বেলগ্রেডের একটি স্কয়ারে ছাত্রদের উল্লাস। ছবি: এএফপি

টানা ১৪ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকার পর সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট স্ট্রংম্যান আলেকসান্দার ভুচিচ ও তাঁর দল সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি (এসএনএস) ক্ষমতা হারিয়েছে। নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে দুই পক্ষের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট বড় ব্যবধানে জয় পায়।

নির্বাচনটি অবাধ ও সুষ্ঠু ছিল না। গণমাধ্যমের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ, বিরোধীদের ওপর সহিংসতা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের প্রকাশ্য অপব্যবহারের অভিযোগ ছিল। এসব বাধা সত্ত্বেও ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ মোট ভোটের ৫৩ শতাংশ পেয়ে ১৪১টি সংসদীয় আসন জিতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। অন্যদিকে, ভুচিচের দল এসএনএস পায় ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট ও ১০৩টি আসন।

শিক্ষার্থীদের এই বিজয়ের পেছনে ছিল কয়েক মাসের আন্দোলন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে নোভি সাদ রেলস্টেশনের একটি ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হন। এই ঘটনার জন্য দায়ীদের শাস্তি দিতে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় মানুষের ক্ষোভ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে সেই ক্ষোভ বড় গণআন্দোলনে রূপ নেয়। এই আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তনের পথ তৈরি করে।

সার্বিয়ার ঘটনা বিশ্বের গণতন্ত্রপন্থী শক্তিগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। আন্দোলন থেকে শুরু করে নির্বাচনী প্রচার, সব ক্ষেত্রেই নেতৃত্ব দিয়েছেন নতুন ও তরুণ মুখেরা। সাধারণ মানুষ তাঁদের পুরোনো রাজনৈতিক নেতাদের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করেছে। এমনকি প্রচলিত বিরোধী দলগুলোর নেতাদের তুলনায়ও শিক্ষার্থীরা বেশি আস্থা অর্জন করতে পেরেছেন।

এ থেকে বোঝা যায়, পুরোনো বিরোধী দলগুলো দুর্বল হয়ে পড়লে, ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আপস করলে কিংবা মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা হারালে নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজন হয়। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা কোনো স্বৈরশাসককে পরাজিত করতে অনেক সময় নতুন মুখ ও নতুন রাজনৈতিক শক্তিই সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

শিক্ষার্থীরা শুধু ভুচিচ সরকারের ভুল ও ব্যর্থতার কথা বলেনি। তারা এমন একটি বার্তা দিয়েছে, যা মানুষের আবেগকে স্পর্শ করেছে এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। সামাজিক মনোবিজ্ঞানের গবেষণা থেকে জানা যায়, মানুষ শুধু রাজনৈতিক নীতি বা প্রতিশ্রুতির কারণে কোনো আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হয় না। নিজেদের পরিচয়, অন্যের কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়া এবং সবার সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ থাকার অনুভূতিও মানুষের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে।

নোভি সাদের দুর্ঘটনার পর দুর্নীতির বিষয়টি সামনে আসে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মূল দাবিগুলোর একটি ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। তবে তারা দুর্নীতিকে শুধু একটি সাধারণ রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখেনি। বরং দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনকে তারা আইনের শাসন, গণতন্ত্র এবং মানুষের মধ্যে ঐক্য ও পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার লড়াই হিসেবে তুলে ধরেছে।

‘স্টুডেন্ট লিস্ট’-এর প্রধান প্রার্থী ইলিয়া সার্দানোভিচ প্রায়ই বলেছেন, ‘আরও ভালো একটি সার্বিয়া গড়ে তোলা সম্ভব।’

শিক্ষার্থীরা এভাবেই গণতন্ত্রকে শুধু একটি রাজনৈতিক ধারণা হিসেবে উপস্থাপন করেনি। তারা দেখিয়েছে, গণতন্ত্র মানুষের গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ রক্ষা করতে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, ব্যক্তিগত মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মতো বাস্তব লক্ষ্য অর্জনেও গণতন্ত্র ভূমিকা রাখতে পারে।

অন্যদিকে, ভুচিচ নিজেকে বিপদের মুখে থাকা সার্বীয় জাতির ‘ত্রাণকর্তা’ ও ‘রক্ষক’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি ছিল, ‘বিশ্বাসঘাতকরা’ সার্বিয়ার ক্ষতি করতে চাইছে। তারা বিদেশি শক্তির হয়ে কাজ করছে এবং ইউক্রেন ও জর্জিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করা তথাকথিত ‘কালার রেভোলিউশন’ বা ‘রঙিন বিপ্লবের’ মতো আন্দোলন সার্বিয়াতেও ঘটাতে চায়।

অতীতের নির্বাচনগুলোতে সার্বিয়ার বিরোধী দলগুলো সাধারণত এসব অভিযোগ উপেক্ষা করেছে। আবার কখনো তারা ভুচিচের চেয়েও কঠোর জাতিগত জাতীয়তাবাদী অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এতে শেষ পর্যন্ত ভুচিচেরই সুবিধা হয়েছে।

সাবেক সার্বীয় প্রদেশ কসোভো নিয়ে ভুচিচের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে শিক্ষার্থীরা মাঝেমধ্যে বক্তব্য দিয়েছে। তবে সার্বিয়া পশ্চিমা শক্তির ষড়যন্ত্রের শিকার, ভুচিচের এই বক্তব্যের সঙ্গে তারা সরাসরি বিতর্কে জড়ায়নি। এর পরিবর্তে শিক্ষার্থীরা নিজেদের কর্মসূচি সামনে এনেছে। তারা সব মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করার মতো মূল্যবোধ ও সুশাসনের পক্ষে কথা বলেছে। জাতীয় পতাকার মতো দেশপ্রেমের প্রতীক ব্যবহার করে মানুষকে নিজেদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর ফলে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে তারা সার্বীয় জাতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছে।

শিক্ষার্থীরা শুধু সভা-সমাবেশ বা প্রচলিত রাজনৈতিক প্রচারের ওপর নির্ভর করেনি। তারা সরাসরি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে। এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের কাছেও নিজেদের বক্তব্য পৌঁছে দিয়েছে। আন্দোলনটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল না। বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছিল। এতে স্বেচ্ছাসেবক ও আন্দোলনকর্মীরা নিজেরাই মানুষের কাছে আন্দোলনের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ পান। এভাবে লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়।

সার্বিয়ার অধিকাংশ গণমাধ্যম সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকায় বিরোধীদের নিজেদের বক্তব্য প্রচারের সুযোগ ছিল সীমিত। এ কারণে সরাসরি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন গড়ে তোলা শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

চলতি বছরের বসন্তে হাঙ্গেরির সংসদীয় নির্বাচনেও একই ধরনের প্রচারের গুরুত্ব দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান টানা ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পর সেই নির্বাচনে ক্ষমতাচ্যুত হন। তাঁর পরাজয় আবারও দেখিয়েছে, ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা এবং ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাওয়ার মতো পুরোনো নির্বাচনী কৌশল এখনো কার্যকর।

বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, নির্বাচনী প্রতিযোগিতার মাঠ যতই অসম হোক না কেন, বিরোধীদের নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। সার্বিয়ার শিক্ষার্থীরা আগের বিরোধী দলগুলোর ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছে, নির্বাচন বর্জন করলে ভুচিচের ক্ষমতা আরও শক্তিশালী হয়েছে। তাই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত তাদের বিজয়ের পথ তৈরি করতে সাহায্য করেছে।

ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ভুচিচ নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত অনেককে অবাক করেছে। এর একটি কারণ ছিল এসএনএস ও স্টুডেন্ট লিস্টের মধ্যে ভোটের বড় ব্যবধান। এত বড় ব্যবধান থাকায় নির্বাচন-পরবর্তী কারচুপি করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে ভুচিচ ও তাঁর মিত্ররা অন্য একটি হিসাবও করছেন। তাঁদের ধারণা, নতুন সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে না। সরকার ব্যর্থ হলে মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হবে। আর সেই হতাশাকে কাজে লাগিয়ে ভুচিচ আবারও ক্ষমতায় ফেরার সুযোগ পেতে পারেন।

এর আগে সার্বিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসকদের নির্বাচনী পরাজয়ের ঘটনা থেকে দেখা গেছে, নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের হারানোই শেষ কথা নয়। একটি উদার গণতন্ত্রবিরোধী শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করা আরও দীর্ঘ ও কঠিন কাজ হতে পারে।

সার্বিয়ার শিক্ষার্থীরা নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথম বড় বাধাটি অতিক্রম করেছে। কিন্তু তাদের সামনে এখন আরও বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন সরকারকে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং আগের শাসনব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো দূর করতে হবে।

আশা করা যায়, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সার্বিয়ার শিক্ষার্থীরা এবারও সঠিক পথ বেছে নেবে। কারণ, ব্যালট বাক্সে স্বৈরশাসককে পরাজিত করা এক বিষয়, আর সেই শাসনের রেখে যাওয়া ব্যবস্থা বদলে একটি কার্যকর গণতন্ত্র গড়ে তোলা সম্পূর্ণ ভিন্ন লড়াই।

প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে অনূদিত

রাশিয়ার ‘ছায়াযুদ্ধের’ ভয়ে তটস্থ ইউরোপ?

নিজ ভূমে পরবাসী: ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি আরব কারা, ক্ষমতা-রাজনীতি ও অধিকার আদায়ে তাদের সংগ্রাম

ইসরায়েলের নির্বাচন ফিলিস্তিন ইস্যুতে নীতির পরিবর্তন আনবে কি

বিশ্লেষকদের ভুল প্রমাণ করে ইসরায়েলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে আরবরা

দিনে দিনে কেন ছোট হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিয়ের আয়োজন

রাজপথের লড়াকু শ্রমিক নেতা থেকে প্রেসিডেন্ট: ব্রাজিলে লুলার প্রত্যাবর্তন যে কারণে ঐতিহাসিক

ভুট্টো কেন নিজেকে ভারতীয় নাগরিক প্রমাণে মরিয়া ছিলেন

যে পাঁচ উপায়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি বদলে দিয়েছেন ট্রাম্প

প্রথম দফায় হেরেও দ্বিতীয় দফায় কীভাবে জিতলেন ব্রাজিলের লুলা

মার্কিন নির্বাচনের পর ইরানে হামলার কৌশলও কেন কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না