হোম > বিশ্লেষণ

১৮৫৭ সালে ডেনমার্ককে ক্ষতিপূরণ দিয়ে টোল বন্ধের বাস্তবতা হরমুজে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

প্রতীকী ছবি

সম্প্রতি ইরানের সঙ্গে যৌথভাবে হরমুজ প্রণালি পরিচালনা ও টোল আদায় করবে বলে জানিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও হোয়াইট হাউস কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা উড়িয়ে দিয়েছিল। যদিও এই ‘যৌথ উদ্যোগ’ বা জয়েন্ট ভেঞ্চার নীতিগতভাবে কার্যকর হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, তবু ট্রাম্পের এই অনিচ্ছাকৃত প্রস্তাবটি বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি গভীর ও কাঠামোগত সত্যকে উন্মোচিত করেছে।

ফরাসি দার্শনিক মঁতেস্কু ১৭৪৮ সালে তাঁর ‘দ্য স্পিরিট অব লজ’ গ্রন্থে লিখেছিলেন, বাণিজ্যের স্বাভাবিক ফল হলো শান্তি। ট্রাম্পের প্রস্তাবটি এই ধারণারই একটি আধুনিক, তবে নিষ্ঠুর সংস্করণ। দীর্ঘদিন ধরে একটি অলিখিত ধারণা ছিল, হরমুজ প্রণালি কারও একার নয়, এটি ‘পাবলিক গুডস’ বা জনসম্পদ। মার্কিন নৌবাহিনীর শ্রেষ্ঠত্ব এই ধারণাকে টিকিয়ে রেখেছিল। কিন্তু ইরান যুদ্ধের ছয় সপ্তাহের মাথায় সেই বাস্তবতা বদলে গেছে। ইরান বর্তমানে প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর মালিকানা ও কার্গো নথি পরীক্ষা করছে এবং ইউয়ান বা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে মাশুল আদায় করছে।

যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে শক্তিশালী হলেও সংকটকে স্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় রূপান্তর করতে পারেনি। ফলে যেই জলপথ আগে ‘সবার’ ছিল, তা এখন দুই শত্রুদেশের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

মঁতেস্কু বিশ্বাস করতেন, ‘দুস কমার্স’ নীতি বাণিজ্য শত্রুতাকে কমিয়ে দেয়। কারণ, দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতা বজায় রাখা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ট্রাম্পের প্রস্তাবটি মঁতেস্কুর এই তত্ত্বের কোনো গভীর দার্শনিক রূপ নয়, বরং এটি বাণিজ্যের একটি ‘কঙ্কালসার’ বা নিছক লেনদেনের রূপ। ট্রাম্প যখন ইরানের সঙ্গে টোল ভাগাভাগির কথা বলেন, তখন তিনি ইরানকে ‘শত্রু’ হিসেবে নয়, বরং একজন ‘ব্যবসায়িক অংশীদার’ হিসেবে দেখছেন। এটি প্রমাণ করে যে যখন সামরিক এবং আইনি কাঠামো ভেঙে পড়ে, তখন ‘টাকা’ বা ‘লেনদেন’ হয়ে ওঠে একমাত্র যুক্তি।

ট্রাম্পের এই প্রস্তাবের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো উপসাগরীয় দেশগুলোর (কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও আরব আমিরাত) ওপর এর প্রভাব। এই দেশগুলোর অস্তিত্ব টিকে আছে হরমুজ প্রণালির ওপর। অথচ ট্রাম্পের প্রস্তাবে তাদের কোনো জায়গাই নেই।

যদি আমেরিকা ও ইরান মিলে টোল আদায় করে, তবে আরব দেশগুলো কার্যত তাদের ঘোর শত্রু (ইরান) এবং তাদের প্রধান মিত্র (আমেরিকা)—উভয়কেই টাকা দিতে বাধ্য হবে তাদের নিজস্ব পণ্য পরিবহনের জন্য। এটি একটি ‘শিকারি’ সমীকরণ, যেখানে ছোট দেশগুলোর সার্বভৌমত্বকে পাশ কাটিয়ে দুই বড় শক্তি বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ ভাগ করে নেয়।

ইউরোপীয় দেশগুলোসহ চীন, জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো যারা জ্বালানির জন্য হরমুজ প্রণালির ওপর ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ নির্ভরশীল, তারা এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। তারা যে জলপথকে আন্তর্জাতিক অধিকার বলে জানত, তার জন্য এখন টোল গুনতে হতে পারে। ইউরোপীয় কমিশন এই টোলকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করলেও সমুদ্রের বর্তমান বাস্তবতা আইনি যুক্তির চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

১৮৫৭ সাল পর্যন্ত ডেনমার্ক ওরেসুন্দ প্রণালিতে এই ধরনের টোল আদায় করত। আইনি যুক্তি দিয়ে তা বন্ধ করা যায়নি; এটি বন্ধ হয়েছিল যখন বড় শক্তিগুলো ‘কোপেনহেগেন কনভেনশনে’ ডেনমার্ককে ক্ষতিপূরণ দিয়ে একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছেছিল। হরমুজ প্রণালিতেও ইরান বর্তমানে যে মাসিক প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার আয়ের পথ তৈরি করেছে, তা কোনো আইনি যুক্তিতে বন্ধ করা কঠিন হবে। এর জন্য হয়তো একটি বড় ধরনের আর্থিক বা রাজনৈতিক সমঝোতার প্রয়োজন পড়বে।

ট্রাম্পের প্রস্তাবটি হয়তো একটি ‘সাররিয়াল’ বা পরাবাস্তব কল্পনা হতে পারে, কিন্তু এটি একটি স্পষ্ট সংকেত দিচ্ছে—পুরোনো আন্তর্জাতিক আইন (যেমন UNCLOS) এখন অকার্যকর হয়ে পড়ছে। যুদ্ধের পর হরমুজ প্রণালি আর আগের অবস্থায় ফিরবে না। এখন প্রশ্নটি আর আইনি নয়, বরং প্রশ্নটি হলো ‘দামের’। বাণিজ্যের এই নতুন যুক্তিতে কে কত মাশুল দেবে এবং কে তা পকেটে ভরবে, তা নিয়েই এখন পর্দার আড়ালে দর-কষাকষি চলছে।

মডার্ন ডিপ্লোমেসি থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ

এবার হরমুজ নিয়ে ট্রাম্পের জুয়া, রাশিয়ার চালে ভেস্তে যেতে পারে ‘মাস্টারপ্ল্যান’

৩১ বছর পর প্রত্যক্ষ সংলাপে ইসরায়েল-লেবানন, হিজবুল্লাহকে ছাড়া কি সমাধান সম্ভব

ইরানের ‘হরমুজ কার্ড’ কি বুমেরাং হতে পারে

ভবিষ্যতে যুদ্ধে জয়ের চেয়ে কঠিন হবে সত্যকে বাঁচিয়ে রাখা

নীরবে পেট্রোডলার চুক্তি বাতিল সৌদির, পেট্রোইউয়ানের উত্থান ঠেকাতেই ইরান যুদ্ধ

নৌ-অবরোধ কী, হরমুজ প্রণালিতে কীভাবে কাজ করবে এই মার্কিন রণকৌশল

ট্রাম্পের ‘ফাইনাল ডিল’ কখনোই ফাইনাল হয় না, ব্যর্থতার নজির শতভাগ

হরমুজে নৌ অবরোধের অর্থ কী, বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া কি ন্যাটো টিকবে

আলোচনা এগিয়ে নিতে আগ্রহী দুই পক্ষই, নজর ট্রাম্পের দিকে