হোম > বিশ্লেষণ

যুদ্ধ থেকে ইরান কী চায়, অর্জন কতটা সম্ভব—তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের নিবন্ধ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

জনসাধারণের জন্য প্রদর্শিত ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ডামি। ছবি: এএফপি

কার্ল ভন ক্লজউৎস বলেছিলেন, যুদ্ধ রাজনীতির সমাপ্তি নয়, বরং অন্য উপায়ে তারই ধারাবাহিকতা। তেহরান ও ওয়াশিংটন যখন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করছিল এবং ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী শান্তি চুক্তি ‘একেবারেই নাগালের মধ্যে’ ছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার টেবিলে নয়, যুদ্ধক্ষেত্রে তার রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের পথ বেছে নেন।

কিন্তু সমস্যা হলো—ট্রাম্পের রাজনৈতিক লক্ষ্য আর পরিষ্কার বা সরল ছিল না। তিনি বারবার যে লক্ষ্য উল্লেখ করেছেন—ইরান যেন কখনো পারমাণবিক অস্ত্র না পায়—তা কূটনীতির মাধ্যমেই সম্পূর্ণভাবে অর্জন করা সম্ভব ছিল। কিন্তু অতিরিক্ত কোনো লক্ষ্য—যেমন শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস, বা এমনকি দেশটির ভাঙন—ট্রাম্পকে আবারও মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধে টেনে নিল, তা স্পষ্ট নয়।

যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট লক্ষ্য ছাড়াই এই যুদ্ধে প্রবেশ করে থাকতে পারে, কিন্তু ইরান তা করেনি। মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার ফলে সংঘাতে জড়িয়ে পড়লেও তেহরান এমন একটি কৌশল অনুসরণ করছে, যা প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার বহু আগে থেকেই ইসলামী প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা, পরিমার্জন এবং শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করা হয়েছিল। এর মূল লক্ষ্য একটিই—ভবিষ্যতের আক্রমণ ঠেকাতে নতুন ধরনের ডিটারেন্ট বা প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনর্গঠন ও পুনর্নির্ধারণ করা।

ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, তিন দশক ধরে যে নীতিকে তারা ‘স্ট্র্যাটেজিক পেশেন্স বা কৌশলগত ধৈর্য’ বলে বর্ণনা করেন, তা ওয়াশিংটন ভয়াবহ ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছে। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়াতে ইরান সচেতনভাবে যে সংযম দেখিয়েছে সেটিকে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়েছে। এতে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এই ধারণা জোরদার হয়েছে যে তেহরানের কাছে সংঘাত বিস্তৃত করার ইচ্ছা বা সক্ষমতা কোনোটিই নেই, কিংবা আঞ্চলিকভাবে বড় ধরনের মূল্য চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাও নেই।

ইরানের দৃষ্টিতে, কয়েকটি ঘটনা এই ভুল ধারণাকে শক্তিশালী করেছে। কুদস ফোর্সের কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে যুক্তরাষ্ট্র হত্যা করার পরের পরিস্থিতি প্রায়ই একটি মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ইরান ইরাকের আল-আসাদ ঘাঁটিতে যে হিসেবকরা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, তা মার্কিন প্রাণহানি এড়িয়ে সংকল্পের বার্তা দেওয়ার জন্য পরিকল্পিত ছিল। কিন্তু ওয়াশিংটনে এটিকে কৌশলগত সংযম নয়, বরং ইরানের দুর্বলতার প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়। ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, এই ব্যাখ্যা মার্কিন সিদ্ধান্তগ্রহণকারীদের আরও সাহসী করে তোলে এবং এই বিশ্বাস জোরদার করে যে তেহরান শেষ পর্যন্ত চাপ সহ্য করবে, কিন্তু এমন প্রতিশোধ নেবে না যা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।

গত জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তেহরানে এক বিরল অভ্যন্তরীণ ঐকমত্য তৈরি করে। সিদ্ধান্ত হয়, দীর্ঘদিনের সংযমের কৌশল শুধু প্রতিপক্ষকে নিরুৎসাহিত করতে ব্যর্থই হয়নি, বরং আরও চাপ প্রয়োগকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। ইরানের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর বিভিন্ন অংশে এই মতৈক্য তাদের আগের নীতির ভিত্তিগত ধারণাগুলোর ওপর একটি বড় পুনর্মূল্যায়ন নির্দেশ করে।

এর আগে তেহরান ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ নামে পরিচিত মিত্র গোষ্ঠীগুলোর একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে একটি প্রতিরক্ষামূলক বেষ্টনী তৈরির চেষ্টা করেছিল। এই অগ্রবর্তী প্রতিরক্ষা কৌশলের উদ্দেশ্য ছিল সম্ভাব্য যেকোনো সংঘাতকে দেশের সীমান্ত থেকে দূরে রাখা, বিশেষ করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধান প্রতিপক্ষদের সঙ্গে। কিন্তু ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে একাধিক প্রত্যক্ষ, যদিও সীমিত, সংঘর্ষ এবং শেষ পর্যন্ত ১২ দিনের যুদ্ধ দেখিয়ে দেয় যে এই কৌশল আর ইরানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না।

এই পরিস্থিতিতে ইরান কৌশল পরিবর্তন করে। ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর তৎকালীন চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল আব্দুলরহিম মুসাভি ঘোষণা করেন, ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরান তার প্রতিরক্ষা নীতি সংশোধন করেছে এবং দ্রুত ও বিস্তৃত অভিযানের ওপর ভিত্তি করে আক্রমণাত্মক অবস্থান গ্রহণ করেছে। তাঁর মতে, ইরানের প্রতিক্রিয়া হবে দ্রুত, সিদ্ধান্তমূলক এবং যুক্তরাষ্ট্রের হিসাব-নিকাশের দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়। একই মাসে সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেও সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালালে তা পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধে রূপ নেবে।

ইরানের নতুন কৌশল ‘শাস্তিমূলক প্রতিরোধ’ ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এটি পারস্য উপসাগর জুড়ে আড়াআড়ি সংঘাত বিস্তারের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের ওপর এমন ব্যয় চাপাতে চায়, যাতে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে অসহনীয় হয়ে ওঠে। আলোচনার টেবিলে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নিজের পক্ষে আনতে ব্যর্থ হলেও, এখন ইরান আশা করছে যুদ্ধক্ষেত্রে তার ভূরাজনৈতিক সম্পদ ব্যবহার করে নতুন ভারসাম্য তৈরি করতে এবং ভবিষ্যতের যেকোনো আগাম হামলা নিরুৎসাহিত করতে পারবে।

এই প্রচেষ্টায় ইরানের সবচেয়ে বড় ভৌগোলিক সুবিধা হলো হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ। এই জলপথ পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল–গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান কার্যত এই রুট বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিঘ্নের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আরেকটি সুবিধা হলো উপসাগরের দক্ষিণাঞ্চলীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের ভৌগলিক নৈকট্য। এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও অংশীদার এবং সেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। স্বল্প-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েও ইরান এসব দেশের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে। তেল ও গ্যাস অবকাঠামোতে আঘাত হানলে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হবে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়বে। গত সপ্তাহে বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্রের অংশ এবং তেহরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান কাতারের রাস লাফান স্থাপনায় বড় আকারের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ইরান সৌদি আরবে সৌদি আরামকো-এক্সন শোধনাগারে ড্রোন হামলা করে এবং কুয়েতের দুটি শোধনাগারেও আঘাত হানে। এসব পদক্ষেপ দেখায়, ইরান প্রথাগত কৌশলগত হিসাবের বাইরে গিয়ে অসম মাত্রায় পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।

এই যুদ্ধ চলবে, যতক্ষণ না এমন কোনো সমঝোতার পথ তৈরি হয়, আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক, যা উভয় পক্ষের কাছে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হবে। ট্রাম্প এই যুদ্ধে প্রবেশের জন্য কোনো স্পষ্ট বা সীমিত রাজনৈতিক লক্ষ্য প্রকাশ করেননি। মোটামুটি তিনি নির্ণায়ক বিজয় এবং ইরানের আত্মসমর্পণকেই চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে দেখছেন। কিন্তু ঝুঁকি হলো, ইরানের নিরাপত্তা নীতি গড়ে উঠেছে অসম যুদ্ধসক্ষমতা এবং পারস্য উপসাগরে তার ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগানোর ওপর। এসব কারণে দেশটিকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা বা তার সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন, অসম্ভব হয়তো নয়।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নৌ সক্ষমতার বড় ক্ষতি করলেও, বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাঙ্কারের চলাচল বিপজ্জনক করে তুলতে ইরানের উন্নত নৌবাহিনী বা আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োজন নেই। ছোট ও দ্রুতগতির আক্রমণ নৌকার বহর, যার উল্লেখযোগ্য সংখ্যা এখনও তাদের কাছে রয়েছে বলে ধারণা করা হয় এবং সস্তা শাহেদ ড্রোন ব্যবহার করেই প্রণালীতে চলাচলের ঝুঁকি বাড়ানো সম্ভব। এর পাশাপাশি, ইরান এখনও তার সবচেয়ে বিধ্বংসী বিকল্প ব্যবহার করেনি, তা হলো হরমুজ প্রণালীতে মাইন পাতা। এই মাইন সরাতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। এতে জ্বালানি সংকট আরও বেড়ে যাবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যুদ্ধের প্রভাব ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে।

তেহরানের দৃষ্টিতে যুদ্ধ শেষ হবে তখনই, যখন তার নতুন ডিটারেন্ট বা প্রতিরোধ ক্ষমতা বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। তার আগে যুদ্ধবিরতি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এতে সেই পরিস্থিতিই আবার ফিরে আসবে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে শাস্তিহীনভাবে ইরানে হামলা চালানোর সুযোগ দিয়েছিল। ইরানের ভঙ্গুর অবকাঠামো মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে, কিন্তু তাদের সরকার মনে করে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লাভ তাৎক্ষণিক ক্ষতির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তেহরানের দৃষ্টিতে এটি একটি নির্ণায়ক যুদ্ধ। হয় ইরান তার প্রতিপক্ষের কাছে নিজের দৃঢ়তার ধারণা বদলে দেবে, নয়তো এমন এক পথে এগোবে যার শেষ হতে পারে শাসনব্যবস্থার পতনে।

অবশেষে উভয় পক্ষকেই আলোচনার টেবিলে ফিরতে হবে। তবে তা হবে যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি হওয়ার পর। সংঘাতের গতিপথ ইঙ্গিত দেয়, কূটনীতি ফিরে আসবে জবরদস্তির বিকল্প হিসেবে নয়, বরং তার ফল হিসেবে। যখন প্রতিটি পক্ষ বুঝবে যে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে কোনো সমঝোতা, আনুষ্ঠানিক হোক বা নীরব, বেশি কৌশলগত সুবিধা দেবে, তখনই আলোচনা শুরু হবে। ফলে নতুন আলোচনা পুরোনো অবস্থায় ফিরে যাওয়ার প্রতিফলন হবে না। বরং সংঘাতের গতিশীলতায় গড়ে ওঠা নতুন বাস্তবতার স্বীকৃতি হিসেবেই তা দেখা হবে।

লেখক: জাকিয়েহ ইয়াজদানশেনাস, তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর অ্যাপ্লাইড রিসার্চ ইন পার্টনারশিপ উইথ দ্য ওরিয়েন্ট-এর সহযোগী ফেলো।

ফরেন পলিসি থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

ইউক্রেনে রাশিয়ার কৌশল যেভাবে কাজে লাগাচ্ছে মিয়ানমার জান্তা

ইরান যুদ্ধে ‘ইয়ো-ইয়ো’ নীতি: শুরু থেকে যেসব পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা কি সত্যিই শুরু হয়েছে

ধাতুর বাজার থেকে উধাও ২ ট্রিলিয়ন ডলার, সোনার ওপর আস্থা তলানিতে কেন

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে কূটনৈতিক খেলোয়াড় হয়ে উঠল পাকিস্তান, ৬ চ্যালেঞ্জের মুখে ‘বিশ্বগুরু’ মোদি

ট্রাম্পের আচরণে ইসরায়েলে অস্বস্তি ও বিভ্রান্তি: ঘরে-বাইরে চ্যালেঞ্জের মুখে নেতানিয়াহু

আলোচনা বনাম অস্বীকার: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক রশি টানাটানির নেপথ্যে কী?

বিশ্ববাজারে কেন সোনা-রুপার দাম কমছে, আরও কত কমবে

স্যামসন অপশন: ইসরায়েলের পরমাণু ডকট্রিন কেন বিশ্বের জন্য হুমকি

ইরান ফাঁদে পা দিয়ে যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ডোবাচ্ছেন ট্রাম্প