হোম > বিশ্লেষণ

তুরস্কের আকাশে ইরানি ড্রোন, এরদোয়ান কি হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন

আবদুল বাছেদ

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। ছবি: আল-জাজিরা

ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ওপর মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক হামলা শুরু হওয়ার আগে থেকেই তুরস্ক একটি ‘পোকার ফেস’ বা ভাবলেশহীন মুখাবয়ব বজায় রাখার চেষ্টা করেছিল। তারা বারবার উত্তেজনা হ্রাসের আহ্বান জানিয়েছিল এবং আঙ্কারার কোনো সামরিক পরিকল্পনা নেই বলে আসছিল। কিন্তু আজ বুধবার (৪ মার্চ) তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তুরস্কের আকাশসীমায় হানা দিয়েছে, যা ন্যাটোর প্রতিরক্ষা বাহিনী ভূমধ্যসাগরের কাছে ডর্টিওল জেলায় সফলভাবে প্রতিহত করেছে। যদিও এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি, তবে এই ঘটনা তুরস্কের জন্য একটি ‘লাল রেখা’ বা রেড লাইন অতিক্রম করার শামিল।

প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের নেতৃত্বাধীন তুর্কি সরকার এখন পর্যন্ত এই সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রয়েছে। যেখানে অনেক মার্কিন মিত্র শেষ পর্যন্ত এই সামরিক অভিযানে সমর্থন দিয়েছে, সেখানে এরদোয়ান হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। এমনকি যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুতে তিনি আনুষ্ঠানিক ‘দুঃখ’ প্রকাশ করেছেন।

তবে এই আঞ্চলিক যুদ্ধে তুরস্কের বর্তমান নিষ্ক্রিয়তার মানে এই নয় যে তারা অনির্দিষ্টকাল কেবল কথার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকবেন। এরদোয়ান মূলত এই সংকট থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায়ের জন্য পরবর্তী পদক্ষেপগুলো হিসাব কষছেন। আপাতত আঙ্কারা ইরান সীমান্তবর্তী পূর্ব সীমান্ত দিয়ে সম্ভাব্য শরণার্থী চাপের কারণে জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা তুলে ধরছেন। এরদোয়ান পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর নেতাদের সাথে টেলিফোনে কূটনৈতিকভাবে একটি যুদ্ধবিরতির পক্ষে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন। তাঁর দাবি, যুদ্ধবিরতি না হলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য একটি ‘অগ্নিকুণ্ডে’ পরিণত হবে।

আঙ্কারা তার ন্যাটো মিত্র ওয়াশিংটনের সাথে তেহরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের অভিযানে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর এই নিরপেক্ষ অবস্থানের কারণেই ইরান এখন পর্যন্ত তুরস্কের কোনো সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়নি, যা তারা সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব বা কাতারের ক্ষেত্রে করেছে। কিন্তু যুদ্ধ যদি কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তবে আঙ্কারা ইরানের ভেতরে সেনা পাঠাতে বাধ্য হতে পারে। আর এর পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হতে পারে ইরানের অস্থিতিশীলতার সুযোগে কোনো ‘কুর্দি গোষ্ঠীর’ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা।

তুরস্কের জন্য ইরানের বিশাল কুর্দি জনগোষ্ঠী একটি বড় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ঝুঁকি। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আঞ্চলিক কুর্দি নেতাদের সঙ্গে একটি টেলিফোন আলাপ করেছেন। যদি ট্রাম্পের উদ্দেশ্য হয় ইরানের ভেতরে কুর্দি বিদ্রোহ উসকে দিয়ে বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা, তবে সেটিই হবে এরদোগানের জন্য ইরানে প্রবেশের মোক্ষম অজুহাত।

তুরস্কের প্রধান ভয় হলো ইরানের ভেতর থাকা কুর্দিস্তান ফ্রি লাইফ পার্টি বা পিজেএকে, গোষ্ঠিটি তুরস্কের নিষিদ্ধ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী পিকেকের একটি শাখা। গত ২২ ফেব্রুয়ারি পিজেএকে অন্য চারটি ইরানি কুর্দি দলের সাথে মিলে একটি জোট গঠন করেছে। তুর্কি উগ্র-জাতীয়তাবাদী সংবাদমাধ্যমগুলো ইতিমধ্যেই শঙ্কা প্রকাশ করছে, পিজেএকে তুরস্কের পূর্ব সীমান্তে একটি ‘সন্ত্রাসী করিডোর’ তৈরি করতে যাচ্ছে, যা কয়েক বছর আগে সিরিয়ার উত্তর সীমান্তে কুর্দি বাহিনী গড়ে তুলেছিল।

প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ইতিমধ্যে বলেছেন, ‘হুমকি যেখান থেকেই আসুক, আমরা সেখানেই তা নির্মূল করব।’ ডর্টিওল জেলায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর তুরস্ক এখন ‘নিরাপত্তা বাফার জোন’ তৈরির অজুহাতে ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সেনা পাঠানোর শক্তিশালী আইনি ও নৈতিক ভিত্তি পেয়েছে। তুরস্ক একটি ন্যাটো সদস্য দেশ। যেহেতু ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এই ক্ষেপণাস্ত্রটি ভূপাতিত করেছে, তাই ভবিষ্যতে ইরান যদি আবারও তুরস্ককে লক্ষ্য করে হামলা চালায়, তবে তুরস্ক ন্যাটোর ‘আর্টিকেল ৫’ (যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি) সক্রিয় করার দাবি তুলতে পারে। এটি হলে আমেরিকা ও ইসরায়েলের সাথে তুরস্ককেও সরাসরি ইরানবিরোধী জোটে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ আঙ্কারার সামরিক অবস্থান নির্দেশ করছে, তাঁরা সীমান্ত পার হয়ে অপারেশন চালানোর জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। যদিও তারা ইরান হামলার বিরোধিতা করছে, তবুও তারা তুরস্কের আকাশসীমায় ন্যাটোর ‘আওয়াকস’ বিমানকে নজরদারি করার অনুমতি দিয়েছে। এই বিমানগুলো শত্রুপক্ষের গতিবিধির ওপর নজর রাখে, যা তুরস্ককে ইরানের ভেতরের তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি সম্পর্কে মূল্যবান গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করবে।

এখন পর্যন্ত সিরিয়া, ইরাক এবং ইরান সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত তুরস্কের ‘সেকেন্ড আর্মি’র পক্ষ থেকে কোনো বড় ধরনের মুভমেন্টের খবর পাওয়া যায়নি। তবুও আঙ্কারা ও পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোতে তুরস্কের সীমান্ত পার হয়ে ইরানে ঢোকার পরিকল্পনা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে।

গত এক দশকে তুরস্কের সামরিক রেকর্ড বলছে, তাঁরা প্রতিবেশী দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনে দ্বিধা করে না। এরদোয়ান সিরিয়ার অখণ্ডতার কথা বারবার মুখে বললেও তুরস্কের সেনাবাহিনী উত্তর সিরিয়ার বিশাল অংশ দখল করে রেখেছে। ইরানের ক্ষেত্রেও তারা একই মডেল অনুসরণ করতে পারে।

তবে ইরানে ঢুকে পড়ার সবচেয়ে বড় কারণ হবে পিজেএকের তৎপরতা। যদি ইরানের কেন্দ্রীয় শাসন ভেঙে পড়ার কারণে কুর্দি যোদ্ধাদের চলাফেরা ও সক্ষমতা বেড়ে যায়, তবে তুরস্ক সীমান্ত পেরিয়ে হামলা চালাবে। তুর্কি সংবাদমাধ্যমগুলো দুটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা বলছে। প্রথমত, শরণার্থী সংকট সামাল দিতে সীমান্তের ভেতরে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করা। দিত্বীয়ত, ইরান রাষ্ট্র হিসেবে ব্যর্থ হলে সীমান্ত থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত একটি ‘বাফার জোন’ বা নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা।

অবশ্য এরদোগানের জন্য এই অভিযানে নামার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তুরস্কের পরবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র দুই বছর বাকি। এরদোয়ান চাচ্ছেন তার ছেলে বেলাল এরদোগানকে দলের নেতৃত্বে নিয়ে আসতে। এমতাবস্থায় একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং ব্যয়বহুল সামরিক মোতায়েন তার দলের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য সুখকর নাও হতে পারে।

লেখক: আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক

ট্রাম্পকে আর বিশ্বাস করতে পারছে না রাশিয়া, আতঙ্ক ভর করেছে

ইরাক যুদ্ধের শিক্ষা ভুলে গেছেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্র কি খাল কেটে আনা কুমির, এবার ভাববে জিসিসি দেশগুলো

ট্রাম্পের যুদ্ধের মস্তিষ্ক হয়ে উঠছে এআই, বিপজ্জনক ভবিষ্যতের পথে বিশ্ব

ইরানের ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’: প্রতিবেশীদের আঙিনায় কেন বোমা ফেলছে তেহরান

ইরানে হামলায় এআই ব্যবহার করছেন ট্রাম্প, কোন পথে বিশ্ব

ইরানেই থামবে না ইসরায়েলের আঞ্চলিক আধিপত্যের যুদ্ধ, ‘আমালেক’ হবে আরও বহু দেশ

ইরানে ৪-৫ সপ্তাহ যুদ্ধ চালাতে চান ট্রাম্প, অস্ত্রের মজুতে কুলাবে কি

ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা আর কত দিন টিকবে

ইরানের ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’ ধ্বংস করা সহজ নয়