হোম > নারী

উপেক্ষিত হচ্ছে নারীজীবন

শাকেরা তাসনীম ইরা, ঢাকা

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব বিরাজ করছে বিশ্বজুড়ে। উষ্ণতা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, খরা এবং চরমভাবাপন্ন তাপমাত্রা প্রাকৃতিক দুর্যোগের পৌনঃপুনিকতার সঙ্গে দুর্ভোগ বাড়িয়েছে লাখ লাখ মানুষের। এর প্রভাব অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও পড়েছে নেতিবাচকভাবে। যদিও অঞ্চল, প্রজন্ম, বয়স, শ্রেণি এবং লিঙ্গের ভিত্তিতে এর প্রভাব ভিন্ন। তবু আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলো বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এরই মধ্যে পুরুষদের তুলনায় বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন নারীরা।

গত ১০ অক্টোবর জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল এবং কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন একটি যৌথ গবেষণা পরিচালনা করে। তাতে জানানো হয়, বিশ্বের ১১৯টি দেশ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা-সংক্রান্ত জাতীয় পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। তাদের মধ্যে মাত্র ৩৮টি দেশ গর্ভনিরোধ, মাতৃত্ব এবং নবজাতকের স্বাস্থ্য পরিষেবার বিষয় পরিকল্পনায় রেখেছে। মাত্র ১৫টি দেশ উল্লেখ করেছে নারীর বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা সহিংসতা রোধে বিভিন্ন প্রকল্প প্রণয়নের কথা। এই প্রতিবেদনটি প্রথমবারের মতো দেখানোর চেষ্টা করেছে, বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিকল্পনাগুলো নারীর যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যকে কতটুকু গুরুত্ব দিচ্ছে।

নারীস্বাস্থ্য ও সহিংসতায় আলোকপাত করা এসব দেশের তালিকায় নেই বাংলাদেশের নাম। অথচ গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স (জিসিআরআই) অনুসারে, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকটে থাকা শীর্ষ ১০ দেশের একটি। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির সূচকে এ দেশের অবস্থান সপ্তম।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব জেসমিন নাহার জানান, জলবায়ু সংকটে নারীদের জন্য আলাদা করে কোনো পরিকল্পনা না থাকলেও ২০২৩ থেকে ২০৫০ সালের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার ৪.৮ অধ্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তনে নারীর অভিযোজন-সংক্রান্ত আলোচনায় নারীর স্বাস্থ্য ও সামাজিক অবস্থানের বিষয়টি খুব স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। সে পরিকল্পনায় বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ-পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে নারীর জন্য নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, স্তন্যপান ও প্রসূতি সুবিধাসহ বিভিন্ন সুবিধা নিশ্চিতকরণের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া উল্লেখ করা হয়েছে, দুর্যোগের সময় লিঙ্গ, বয়স ও অক্ষমতা অন্তর্ভুক্ত অনুসন্ধান এবং উদ্ধার কর্মসূচির কথাও। পরিকল্পনায় আরও বলা হয়েছে, লৈঙ্গিক সমতার ভিত্তিতে, বিশেষ করে নারীদের জন্য জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তির ব্যবহারকে উৎসাহিত করার কথা।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়গুলো সঠিকভাবে মোকাবিলা করার জন্য ২০২১ সালে বাংলাদেশ সরকার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় তৈরি করেছে। ২০২২ সালে মিসরের শারম-আল-শেখে অনুষ্ঠিত ২৭তম বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন কপ২৭-এ অংশ নিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের সামনে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশের প্রতিনিধিত্ব করেন নারীরা। জীবিকা নির্বাহের জন্য এসব নারী প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের নারীরা প্রতিদিন যে ধরনের কাজ করেন, তার প্রায় পুরোটার উৎস প্রকৃতি। সেখানে কোনো ধরনের পরিবর্তন এলে সবার আগে তার প্রভাব পড়ে নারীদের ওপর। বাংলাদেশের উপকূল, পাহাড়ি ও দুর্গম অঞ্চলগুলোতে এসব কারণে প্রতিনিয়ত কমছে নারী শিক্ষার্থীর হার। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রতিবছর প্রায় ৩৬ শতাংশ মেয়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে উপকূল, পাহাড়ি ও দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলগুলোতে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে প্রতিবছর লবণাক্ততার পরিমাণ বাড়ছে। এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ছে নারী ও কন্যাশিশুদের ওপর। উপকূলীয় অঞ্চলে খাবারসহ দৈনন্দিন কাজে অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে বিভিন্ন ধরনের রোগ বেড়েই চলেছে নারীদের মধ্যে। প্রতিবন্ধী শিশুর জন্মহার গত কয়েক বছরে বেড়েছে কয়েক গুণ সে অঞ্চলে। উপকূলীয় অঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে পরিষ্কার পানির অভাবে নারীরা দূষিত লবণাক্ত পানিতে ঋতুস্রাবের কাপড় পরিষ্কার ও গোসল করতে বাধ্য হচ্ছে। এর প্রভাব সরাসরি প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর পড়ছে। পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান অতিরিক্ত তাপমাত্রা মাতৃস্বাস্থ্য ও গর্ভাবস্থার সঙ্গেও বিশেষভাবে সম্পর্কিত। জলবায়ু সংকটের ফলে বিশ্বজুড়ে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের হার বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি করেছে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল।

জলবায়ু সংকট নারীর আর্থসামাজিক অবস্থায়ও ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। গত কয়েক বছরে জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মানুষের কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে এসেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে মৌসুমি অভিবাসন। এই অভিবাসনের কারণে নারীর ওপর পড়ছে বিরূপ প্রভাব। কাজের সন্ধানে পুরুষেরা যখন সাময়িকভাবে অভিবাসী হচ্ছে, তখন আবার বাড়ছে বহুবিবাহের সংখ্যা।

আবার কারও কারও স্বামী ফিরে আসছেন না বলে নারীরা বিভিন্ন সামাজিক সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। বৃদ্ধি পাচ্ছে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির হার। উপরন্তু জলবায়ু সংকট দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর অর্থনৈতিক বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। এর প্রভাব এসে পড়ছে পরিবারের কিশোরী মেয়েটির ওপর। তাকে তড়িঘড়ি বিয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হচ্ছে পরিবার। যে কারণে গত কয়েক দশকে প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে বাল্যবিবাহের সংখ্যা।

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর তেমন কোনো হাত না থাকলেও এর শাস্তি বেশি ভোগ করে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো। এ সংকটের প্রভাব রোধে বিশেষ জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করা দরকার। পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াগুলোতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাও জরুরি। 

তথ্যসূত্র: অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন, ইউনাইটেড ন্যাশনস ক্রনিকেল, বিবিসি, দ্য নিউ হিউম্যানিটারিয়ান এবং অন্যান্য। 

শরিয়তি ফারায়েজ অনুযায়ী মেয়ের সন্তান নানার সম্পত্তির সরাসরি ওয়ারিশ হয় না

নিরাপত্তাহীন নারী ও শিশু, সংখ্যা বাড়ছে নির্যাতিতের

শেক্‌সপিয়ার বিশেষজ্ঞ ভয়ংকর এক নারী ইয়েং থিরিথ

ক্ষত আর স্বপ্ন নিয়ে নতুন ভোরের অপেক্ষায় নারীরা

বইকে বেঁচে থাকার শক্তি হিসেবে দেখাতে চান দিয়া

সৌন্দর্যশিল্পের মুকুটহীন সম্রাজ্ঞী এলিজাবেথ আরডেন

বড়দিনের বিখ্যাত গানগুলোর নেপথ্যের নারীরা

উদ্যোক্তা মেলা: সংখ্যা কমলেও আশাবাদী নারী উদ্যোক্তারা

রোজের ফুটে ওঠার গল্প

আন্তর্জাতিক নারী: অন্ধকার আকাশ যাঁর ল্যাবরেটরি