হোম > নারী

আন্তর্জাতিক নারী: বিষাদ আর বীরত্বের গল্প রচিত হয়েছিল যাঁর আঙুলের ডগায়

ফিচার ডেস্ক

যুদ্ধক্ষেত্রে জার্মান সেনাদের মধ্যে এক নীরব আতঙ্কের নাম ছিলেন লিউডমিলা পাভলিচেনকো। ছবি: সংগৃহীত

শিকাগোর এক জনাকীর্ণ হলরুম। সামনে বসা শত শত মার্কিন পুরুষ, সাংবাদিক আর উৎসুক জনতা। সবাই নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন। সেই মুহূর্তে এক নারী সেনা ডায়াসে উঠে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেন। সরাসরি দর্শকদের চোখের দিকে তাকিয়ে ছুড়ে দিলেন একটি প্রশ্ন। ‘সুধী, আমার বয়স এখন ২৫ বছর। আর এই সময়ের মধ্যে আমি ৩০৯ জন ফ্যাসিস্ট হানাদারকে খতম করেছি। আপনাদের কি মনে হয় না, আপনারা একটু বেশি দীর্ঘ সময় ধরে আমার পিঠের পেছনে লুকিয়ে আছেন?’ অনুবাদক ভাঙা-ভাঙা কণ্ঠে রুশ শব্দগুলো ইংরেজিতে রূপান্তর করলেন। শুনে পুরো হলরুমে নেমে এসেছিল পিনপতন নীরবতা। অথচ কিছুক্ষণ আগেও উপস্থিত সেনারা নারী যোদ্ধার সামরিক পোশাকের ঝুল, মেকআপের অভাব কিংবা অন্তর্বাসের রং নিয়ে সস্তা, লৈঙ্গিক বৈষম্যমূলক আর আপত্তিকর প্রশ্ন করতে ব্যস্ত ছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে দাঁড়িয়ে এই একটি বক্তব্যই বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসে এক নতুন মোড় এনে দিয়েছিল। বক্তার নাম লিউডমিলা পাভলিচেনকো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ওডেসা আর সেভাস্তোপোলের যুদ্ধক্ষেত্রে জার্মান সেনাদের মধ্যে এক নীরব আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। ১৯১৬ সালে জন্ম নেওয়া ইউক্রেনীয় এই সুন্দরীর বড় পরিচয় হলো, তিনি সর্বকালের অন্যতম সেরা নারী স্নাইপার। ১৯৪১ সালে হিটলারের ওয়েরমাখট বাহিনী যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে, তখন লিউডমিলা ছিলেন কিয়েভ বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী। শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন এক পাশে সরিয়ে তিনি সোজা চলে যান ওডেসার রিক্রুটিং অফিসে। সাধারণ নার্স হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে জেদ ধরেন ইনফ্যান্ট্রিতে যোগ দেওয়ার। নিখুঁত নিশানায় দুজন রোমানিয়ান সহযোগীকে খতম করতেই মেলে লাল ফৌজের ২৫তম রাইফেল ডিভিশনে স্নাইপার হিসেবে যোগ দেওয়ার টিকিট। যুদ্ধক্ষেত্রে লিউডমিলার মূল অস্ত্র ছিল একটি এসভিটি-৪০ সেমি-অটোমেটিক রাইফেল এবং তার সঙ্গে যুক্ত ৩ দশমিক ৫এক্স টেলিস্কোপিক সাইট।

রোমহর্ষক ছিল তাঁর কাউন্টার-স্নাইপিং মিশনগুলো। এটি ছিল মূলত ছায়ার সঙ্গে ছায়ার যুদ্ধ। সেখানে লিউডমিলা ৩৬ জন উচ্চ প্রশিক্ষিত জার্মান স্নাইপারের মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং প্রতিটি মরণজয়ী দ্বৈরথেই তিনি জয়ী হন। জার্মানদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘দ্য রাশিয়ান বিচ ফ্রম হেল’ নামে। লাউডস্পিকারে তাঁকে লোভনীয় চকলেট আর অফিসার পদের টোপ দেওয়া হতো। কাজ না হওয়ায় হুমকি আসত, ‘ধরে তোমাকে ৩০৯ টুকরা করে বাতাসে উড়িয়ে দেওয়া হবে!’ ১৯৪২ সালের জুনে এক মর্টার শেলের আঘাতে গুরুতর আহত হন লিউডমিলা। এরপর ক্ষতবিক্ষত মুখ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর এক মাসের মধ্যে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে সোভিয়েত সরকারের কাছে তত দিনে তিনি এক মহামূল্যবান সম্পদে পরিণত হয়েছেন। তাই সুস্থ হওয়ার পর তাঁকে আর ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হয়নি। তাঁকে যুদ্ধ থেকে সম্মানজনক অবসর দিয়ে যুদ্ধের প্রচারণায় বিশ্বভ্রমণে পাঠানো হয়। ওয়াশিংটনে গিয়ে প্রথম সোভিয়েত নাগরিক হিসেবে হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করেন তিনি। সেখানে তাঁর বন্ধুত্ব হয় ফার্স্ট লেডি এলিনর রুজভেল্টের সঙ্গে। যুদ্ধক্ষেত্রে অসামান্য বীরত্বের জন্য সোভিয়েত সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা ‘হিরো অব দ্য সোভিয়েত ইউনিয়ন’ উপাধিতে ভূষিত করে।

১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তিনি কিয়েভ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁর পড়াশোনা শেষ করে একজন ইতিহাসবিদ হিসেবে জীবন কাটান। ১৯৭৪ সালে স্ট্রোক করে মারা যান এই কিংবদন্তি। ২০১৫ সালে এই অকুতোভয় নারী স্নাইপারের রোমাঞ্চকর ও যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবজীবনের গল্প নিয়ে তৈরি হয় বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘ব্যাটল ফর সেভাস্তোপোল’।

সূত্র: দ্য ন্যাশনাল ডব্লিউডব্লিউ২ মিউজিয়াম

‘সুফিয়া কামাল ছিলেন মানুষের আশ্রয়স্থল’

প্রেসিডেন্টের টিকিটে ভিআইপি গ্যালারি জয়

বেঙ্গল রেনেসাঁর বিস্মৃত আলো সুনয়নী দেবী

নারীর ওপর দায় চাপানোর চর্চা লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বাড়াচ্ছে: সংলাপে বক্তারা

খেলাধুলায় পুরুষদের একচেটিয়া আধিপত্য কারণ কি শুধুই প্রচার নাকি বিবর্তন

চুলার ধোঁয়ার যন্ত্রণা, গ্রামীণ নারীর নীরব সংগ্রাম

বিশ্বকাপ মঞ্চে নারীদের প্রতিবাদের ডাক

ফিফার প্রথম নারী ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ

ডিজিটাল মাধ্যমে নারীবিদ্বেষ মোকাবিলায় চলচ্চিত্র উদ্যোক্তাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান

চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্রিটিশদের দুর্গ জয় করা এক বাঙালি নারী