কচ্ছপ শুধু একটি প্রাণী নয়, ওরা সি গ্রাস আর প্রবাল প্রাচীর সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। তাই কচ্ছপ বাঁচানো পুরো সমুদ্র বাঁচানোর মতো।
লিয়া মাইন্যে
২৩ মে, শনিবার বিশ্ব কচ্ছপ দিবস। এ উপলক্ষে রইল দুই নারীর লড়াইয়ের গল্প।
তখনো পুরোপুরি সকাল হয়নি। ভারত মহাসাগরের নীল পানি ধীরে ধীরে রোদে চকচক করতে শুরু করেছে। দূর থেকে ভেসে আসছে ঢেউয়ের গর্জন। কেনিয়ার দক্ষিণ উপকূলের ছোট্ট একটি ডাইভ সেন্টারে তখন চলছে দিনের প্রস্তুতি। কেউ ডাইভিং মাস্ক পরিষ্কার করছেন, কেউ পানিতে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কেউ আবার ঠিক করছেন অক্সিজেন ট্যাংক। এই ব্যস্ততার মধ্যে শান্ত চোখে একজন সবকিছু দেখছেন।
তাঁর হাতে ক্যামেরা আর কাঁধে দায়িত্ব। একটু পরেই তিনি ডাইভ দেবেন সমুদ্রের গভীরে। কোনো রোমাঞ্চের খোঁজে নয়, হারিয়ে যেতে বসা সামুদ্রিক কচ্ছপদের খুঁজে বের করতে। তাদের জন্যই জীবন বদলে ফেলেছিলেন কেনিয়ার যে দুই নারী, তিনি তাঁদের একজন। সামুদ্রিক কচ্ছপ বাঁচাতে উপকূলে তাঁদের লড়াইয়ের গল্পটা একটু ভিন্ন।
ভারত মহাসাগরের প্রবাল প্রাচীরের গা ঘেঁষে দুলতে থাকা সি গ্রাস আর সাদা বালুর নিচে লুকিয়ে আছে কচ্ছপদের জগৎ। সেখানে ডাইভ দেওয়ার আগে লিয়া মাইন্যে সবাইকে বুঝিয়ে দেন, কীভাবে কচ্ছপের কাছে যেতে হয়, কীভাবে সামুদ্রিক প্রাণীদের কাছাকাছি গিয়ে তাদের বিরক্ত না করে পর্যবেক্ষণ করতে হয় আর কোন তথ্যগুলো সংগ্রহ করতে হবে।
পানিতে নামার পর নিস্তব্ধ হয়ে যায় চারপাশ, শোনা যায় শুধু স্রোত আর বুদ্বুদের শব্দ। কোথাও মাছের ঝাঁক, কোথাও ভেসে বেড়ানো কচ্ছপ। পানিতে নামার পর, ওপরের সব শব্দ হারিয়ে যায়। ক্যামেরা হাতে লিয়ার আসল কাজ শুরু হয় তখনই। দিন শেষে ডাইভাররা ফিরে যান নিজেদের অফিসে। তোলা প্রতিটি ছবি যাচাই করা হয়। এরপর সেগুলো আন্তর্জাতিক ডেটাবেইসে যুক্ত হয়, যাতে গবেষকেরা কচ্ছপদের সংখ্যা ও চলাচল সম্পর্কে জানতে পারেন।
লিয়া মাইন্যে সামুদ্রিক গবেষক ও ডাইভার হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর নেতৃত্বে চলছে অলিভ রিডলি প্রজেক্ট, কেনিয়া। কচ্ছপ সংগ্রহই তাদের মূল লক্ষ্য। তাঁর প্রতিদিনের কাজ কচ্ছপদের খুঁজে বের করা, তাদের ছবি তোলা, আচরণ পর্যবেক্ষণ করা এবং পৃথিবীজুড়ে গবেষকদের জন্য তথ্য পাঠানো। বিশ্বের সাত প্রজাতির সামুদ্রিক কচ্ছপের মধ্যে ছয়টিই আজ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। কেনিয়ার উপকূলে পাওয়া যায় এমন পাঁচ প্রজাতির কচ্ছপের সব কটির জীবনই বিপন্ন প্রায়। বিপদের কারণ হয়ে উঠেছে সমুদ্রে ফেলা মাছ ধরার জাল। তাতে আটকে মারা যায় অনেক কচ্ছপ। লিয়া একটি বিশেষ সফটওয়্যার দিয়ে কচ্ছপের মুখের আঁশের অবস্থা দেখে তাদের আলাদা শনাক্ত এবং ড্রোন ব্যবহার করে সমুদ্রের বিশাল এলাকা পর্যবেক্ষণ করেন।
কেনিয়ার এক জেলে গ্রামে বড় হওয়া তরুণী ফতুমা সেলিম। তাঁর ছোটবেলার স্মৃতিতে রয়েছে, আগুনে পোড়া কচ্ছপের মাংসের গন্ধ। কারণ, তাঁর এলাকায় কচ্ছপ খাওয়া ছিল স্বাভাবিক বিষয়। লিয়া মাইন্যে একবার তাঁদের গ্রামে গিয়েছিলেন কচ্ছপ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে। সেখানে সবাইকে পুরোনো কিছু কচ্ছপের ছবি দেখান তিনি। যে কচ্ছপগুলোকে বছরের পর বছর ধরে গবেষকেরা শনাক্ত করেছিলেন। সেসব ছবি দেখে ফাতুমার মনে হয়েছিল, কচ্ছপেরা শুধু প্রাণী নয়, তাদের প্রত্যেকের আলাদা জীবন আছে।
কচ্ছপ খাওয়া যাবে না—বিষয়টি গ্রামের বয়স্ক মানুষদের বোঝানো সহজ ছিল না। ফতুমা বোঝানোর ক্ষেত্রে শুরুটা করেছিলেন শিশুদের দিয়ে। তিনি শিশুদের কচ্ছপের গল্প শোনানো শুরু করেন। সেসব গল্প শুনে তারা বাড়ি গিয়ে বাবা-মাকে বলতে শুরু করে, কচ্ছপ খাওয়া যাবে না। কারণ, তারা বিপন্ন। অভিভাবকেরা ধীরে ধীরে সন্তানদের কথা শুনতে শুরু করেন। এভাবেই বদলাতে থাকে একটি গ্রামের চিন্তাধারা। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ফতুমা নিজ গ্রামে টার্টল অ্যাম্বাসেডর নামে পরিচিত। তিনি জানান, কোনো কচ্ছপ জালে আটকে গেলে এখন জেলেরা তাঁকেই ডাকেন। তাঁরা একসঙ্গে জাল খুলে কচ্ছপদের আবার সমুদ্রে ফিরিয়ে দেন।