বিয়ের সব প্রস্তুতি সারা। বড় হোটেল বুকিং দেওয়া হয়েছে। বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য উপস্থাপকও ঠিক করা হয়ে গেছে। হঠাৎ কনে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তারপর গলাব্যথা নিয়ে গেলেন স্থানীয় ক্লিনিকে। আর ভুল চিকিৎসা ওলট-পালট করে দিল সব। সামান্য ঠান্ডা-জ্বর থেকে কোমায় চলে গেলেন কনে। অবশেষে দীর্ঘ তিন মাস কোমায় থাকার পর বিয়ের ঠিক দুই দিন আগে চোখ খুলে তাকান কনে ওয়াং রানরান।
হবু স্বামী ঝাং জিরুইয়ের সঙ্গে ছয় বছরের প্রেমের সম্পর্ক চীনের শানডং প্রদেশের তাইআন শহরের বাসিন্দা ২৪ বছর বয়সী ওয়াং রানরানের। প্রেম থেকে পরিণয়ে এগোতে গত বছরের শেষ দিকে তাঁরা আইনিভাবে বিয়ের নিবন্ধন সম্পন্ন করেন এবং চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল ধুমধাম করে বিয়ের অনুষ্ঠান করার কথা ছিল।
গত জানুয়ারিতে ওয়াংয়ের গলাব্যথা শুরু হলে তিনি সাধারণ ঠান্ডা মনে করে হবু স্বামী ঝাংয়ের সঙ্গে কাছের ‘দাইইউ জিন মেডিকেল হল’ ক্লিনিকে যান। ছোট হলেও ক্লিনিকটির সুনাম ছিল। কিন্তু সব পাল্টে দিল একটি ইনজেকশন। সুখের দিন ফুরিয়ে যেন দুঃস্বপ্নের শুরু হলো।
হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম হংক্সিং নিউজকে স্বামী ঝাং বলেন, ওই সময় ক্লিনিকে দুজন কর্তব্যরত ছিলেন। সামান্য আলোচনার পর একজন নারী ওয়াংকে ওষুধ লিখে দেন আর একটি ইনজেকশন পুশ করেন। ইনজেকশন দেওয়ার আগে তাঁরা একবারও জানতে চাননি, ওয়াংয়ের কোনো ওষুধে অ্যালার্জি আছে কি না, এমনকি কোনো স্কিন টেস্টও করা হয়নি।
ইনজেকশন নেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওয়াং অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর জিহ্বা অবশ হয়ে আসে, শুরু হয় বমি ও প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট। পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক দেখে ঝাং দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স ডাকেন। কিন্তু প্যারামেডিকরা পৌঁছানোর আগেই ওয়াং ‘অ্যালার্জিক শকে’ চলে যান।
ঝাংয়ের অভিযোগ, ওই সংকটকালে ক্লিনিকের কর্মীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন এবং কার্যকর কোনো জরুরি চিকিৎসাসেবা দিতে পারেননি।
হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা জানান, ওয়াং ‘অ্যাসিডোসিস’ ও শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতায় ভুগছেন। ভুল ওষুধের কারণে হওয়া অ্যালার্জিক শক থেকে এই অবস্থা হয়েছে। দীর্ঘ চার মিনিটের বেশি সময় তাঁর মস্তিষ্কে অক্সিজেন পৌঁছাতে পারেনি। ফলে মস্তিষ্কের স্থায়ী ও অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে।
এই ঘটনায় ঝাং চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে আইনি সহায়তা চান। তদন্তে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ইনজেকশন পুশ করা ওই নারী কোনো নিবন্ধিত চিকিৎসাকর্মী ছিলেন না। এমনকি ব্যবস্থাপত্রে স্বাক্ষরকারী ব্যক্তিরও চিকিৎসা দেওয়ার কোনো বৈধ সনদ ছিল না। ঘটনার পর ক্লিনিকটি বন্ধ হয়ে যায়। অভিযুক্ত ওই নারী ওয়াংয়ের পরিবারকে ২ লাখ ইউয়ান (প্রায় ৩২ লাখ টাকা) ক্ষতিপূরণ দিয়ে গা ঢাকা দেন। তবে ঝাং জানান, ওয়াংয়ের চিকিৎসার পেছনে ইতিমধ্যে ৭ লাখ ইউয়ানের (প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ টাকা) বেশি খরচ হয়ে গেছে।
ঝাং আরও বলেন, পরিবারের সদস্যরা পালা করে হাসপাতালে ওয়াংয়ের দেখাশোনা করছেন, ফলে সবারই কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। আর্থিক ও মানসিক সংকটে জর্জরিত পরিবারটি যখন খাদের কিনারায়, তখনই ঘটে সেই অলৌকিক ঘটনা।
কোমায় যাওয়ার ৯২ দিন পর গত ২৩ এপ্রিল প্রথমবারের মতো চেতনার লক্ষণ দেখান ওয়াং। তিনি চোখ খোলেন এবং ঝাংয়ের দিকে তাকিয়ে হাসেন। তবে তিনি এখনো কথা বলতে বা নড়াচড়া করতে পারছেন না, তবু এই হাসিই যেন নতুন জীবনের বার্তা দিয়ে গেল। অশ্রুভেজা চোখে ঝাং সংবাদমাধ্যমকে বলেন, সেই সুন্দর চোখ দুটো অবশেষে প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
হবু স্ত্রীর হাত ধরে ঝাং প্রতিজ্ঞা করেছেন, ‘তুমি যখনই তোমার বিয়ের পোশাক পরতে পারবে, আমি তখনই তোমাকে নিতে আসব।’
ঘটনাটি চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘ওয়াং জানতেন, তাঁর বিয়ের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি, তাই তিনি জেগে উঠেছেন। শক্ত থাকো, সুন্দর কনে!’
অন্য একজন মন্তব্য করেছেন, ‘পালিয়ে যাওয়া ওই ছদ্মবেশী চিকিৎসকদের খুঁজে বের করা উচিত। তারা যাতে আর কারও ক্ষতি করতে না পারে, এমন ব্যবস্থা করা উচিত।’