এবার ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু জনপ্রিয় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে ইন্দোনেশিয়া। এর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে অনলাইনে হয়রানি ও ক্ষতিকর বিষয়বস্তু থেকে সুরক্ষিত রাখতে বিধিনিষেধ আরোপকারী দেশগুলোর তালিকায় সর্বশেষ নাম হিসেবে যুক্ত হলো দেশটি।
ইন্দোনেশিয়ার যোগাযোগ ও ডিজিটাল বিষয়ক মন্ত্রী মেউতিয়া হাফিদ ঘোষণা করেছেন, ২৮ মার্চ থেকে কিছু প্ল্যাটফর্মকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ বিবেচনা করে সেগুলোতে ১৬ বছরের কম বয়সীদের অ্যাকাউন্টগুলো নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হবে।
মেউতিয়া হাফিদ জানান, প্রাথমিকভাবে ইউটিউব, টিকটক, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, থ্রেডস, এক্স (সাবেক টুইটার), বিগো লাইভ ও রবলক্সের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে।
মেউতিয়া হাফিদ আরও উল্লেখ করেন, এই নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে প্রথম কোনো অপশ্চিমা দেশ হিসেবে ইন্দোনেশিয়া বয়সভেদে শিশুদের ডিজিটাল জগতে প্রবেশের সুযোগ পিছিয়ে দিচ্ছে।
তবে দেশটির এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মগুলোর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
মেউতিয়া হাফিদ বলেন, ‘পর্নোগ্রাফি দেখা, সাইবার বুলিং, অনলাইন প্রতারণা থেকে শুরু করে অনলাইনে আসক্তিসহ নানা সমস্যায় পড়ছে শিশুরা। আর এটি ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এই আসক্তিই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।’
মেউতিয়া হাফিদ আরও বলেন, ‘সরকার এখন হস্তক্ষেপ করছে, যাতে অ্যালগরিদমনির্ভর প্ল্যাটফর্মগুলোর মতো বড় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিভাবকদের একা লড়াই করতে না হয়।’
২০২৩ সালে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, জরিপে অংশ নেওয়া ৫১০ জন ইন্দোনেশীয় শিশুর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যৌন উত্তেজক ছবির সংস্পর্শে এসেছে।
নিষেধাজ্ঞার এই খবরে ৪২ বছর বয়সী কর্মজীবী নারী আমান্ডা কুসুমো বিবিসিকে বলেন, ‘আমি একজন কর্মজীবী মা, আমার দুই সন্তান রয়েছে। বিশেষ করে বড় ছেলেটি কিশোর হওয়ায় ডিজিটাল জগতে সে কী করছে, তা সব সময় দেখে রাখার মতো সময় আমার থাকে না।’
আমান্ডা কুসুমো আরও বলেন, ‘সরকার যদি এ ধরনের নিয়ম চালু করে, তাহলে অভিভাবক হিসেবে আমাদের উদ্বেগ অনেকটাই কমে। আমি বিশ্বাস করি, সরকারের এই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত শিশু ও অভিভাবক উভয়ের জন্যই ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।’
তবে আমান্ডার ১৭ বছর বয়সী ছেলে ম্যাট জোসেফ এই নিষেধাজ্ঞার পক্ষে ও বিপক্ষে দুই ধরনেরই যুক্তি দেখছে। তার ভাষ্য, ‘এটা ঠিক যে শিশুরা এখনো নিজেদের স্ক্রিন টাইম ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না বা ফোন ব্যবহারে সংযম দেখাতে পারে না। কিন্তু সরকার যদি এ জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচিত করে সব প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়, আমার মনে হয়, এর চেয়ে আরও নমনীয় ও বুদ্ধিদীপ্ত কোনো উপায় খুঁজে নেওয়া যেত।’
ম্যাটের মতে, তরুণেরা যা পছন্দ করে তার বেশির ভাগই আসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে। সরকার যদি চায়, তারা এগুলো কম ব্যবহার করুক, তবে তাদের জন্য বিকল্প উৎসাহের ব্যবস্থা করতে হবে; যেমন টেলিভিশনের অনুষ্ঠানগুলোর মানোন্নয়ন করা যেতে পারে।
সে আরও যোগ করে, ‘এমন বিনোদন থাকলে ভালো হতো, যা আমাদের কথা ভেবে তৈরি করা হয়েছে, যা আমাদের শেখার পাশাপাশি আনন্দও দেবে।’
এদিকে ইন্দোনেশিয়ার শিশু সুরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, সরকারের পরিকল্পনাগুলো বিস্তারিত পর্যালোচনা না করে তারা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারছে না।
ইনস্টিটিউট ফর পলিসি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসির (ইএলএসএএম) নুরুল ইজমি বলেন, বিধিমালার চূড়ান্ত খসড়া দেখার সুযোগ তিনি পাননি। তবে সাধারণভাবে শিশুদের সুরক্ষা শুধু বয়সভিত্তিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নে শিশুদের লক্ষ্য করে প্রোফাইলিংভিত্তিক বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ।
নুরুল ইজমি বলেন, “শিশু সুরক্ষার নিরাপদ নীতিমালার ভিত্তি হওয়া উচিত ‘সেফটি বাই ডিজাইন’ বা নকশাতেই নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা। ”
ইজমি আরও সতর্ক করে বলেন, বয়স যাচাইয়ের পদ্ধতি কার্যকর করার অর্থ হলো শিশুদের সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা। তাই এই তথ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়া সঠিক নীতিমালা অনুসরণ করে হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শিশুদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার বা তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়টি উপেক্ষা করা যাবে না। মানবাধিকার অনুযায়ী, কোনো অধিকারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে হলে তা আইনসম্মত, প্রয়োজনীয় এবং আনুপাতিক হতে হবে।’
গত ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে আইনি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর শুরু করার পর ইন্দোনেশিয়া এই ঘোষণা দিল। বিশ্বের অনেক দেশই এখন অস্ট্রেলিয়ার এই নীতি পর্যবেক্ষণ করছে।
সমালোচকরা অস্ট্রেলিয়ার সরকারকে রবলক্স এবং ডিসকর্ডের মতো অনলাইন গেমিং সাইটগুলোকেও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন, এগুলো বর্তমানে ওই নীতিমালার আওতায় নেই।
পাশাপাশি বয়স যাচাইয়ের প্রযুক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাঁরা। সমালোচকদের মতে, এটি অনেক সময় ভুল করে প্রাপ্তবয়স্কদেরও ব্লক করতে পারে, আবার অপ্রাপ্তবয়স্কদের শনাক্ত করতে ব্যর্থ হতে পারে
তবে ইন্দোনেশিয়া ছাড়াও স্পেন এবং অন্যান্য কিছু দেশ জানিয়েছে, তারা অস্ট্রেলিয়ার পথ অনুসরণ করবে।
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে যুক্তরাজ্যও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা চালুর বিষয়ে জনমত যাচাই শুরু করেছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে তারা তরুণ প্রজন্ম, অভিভাবক এবং তত্ত্বাবধায়কদের কাছ থেকে মতামত আহ্বান করেছে।
ইন্দোনেশিয়া এর আগেও অনলাইনে যৌন উত্তেজক বিষয়বস্তু প্রতিরোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন (এআই) চ্যাটবট ‘গ্রোক’-এ প্রবেশাধিকারও বন্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া অনলিফ্যানস এবং পর্নহাবসহ পর্নোগ্রাফি ছড়ায় এমন অন্যান্য অনলাইন উৎসও দেশটিতে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।