হোম > প্রযুক্তি

কিশোর-কিশোরীদের ‘ইটিং ডিজঅর্ডার’ কনটেন্ট দেখার পরামর্শ দিচ্ছে ইউটিউব, দাবি গবেষকদের

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

যুক্তরাজ্যের লেস্টারের বাসিন্দা ২২ বছর বয়সী জেসমিন কৌর। ১৩ বছর বয়সে তাঁর ‘অ্যানোরেক্সিয়া’ (ক্ষুধামন্দা ও ওজন কমে যাওয়ার রোগ) ধরা পড়ে। এরপর টানা ছয় বছর তাঁকে চিকিৎসা নিতে হয়। জেসমিন বলেন, ‘শুরুটা খুব স্বাভাবিকভাবেই হয়েছিল। আমি আরও ফিট ও সুস্থ হতে চেয়েছিলাম। তাই অনলাইনে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করি এবং তথ্যের সত্যতা না জেনেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সবকিছুকে সত্যি বলে ধরে নিই।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিবার হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আমার সঙ্গে ফোন থাকত। আমি অনবরত সেটি স্ক্রল করতাম। শেষের দিকে আমার সামনে এত চরম মাত্রার কনটেন্ট আসত যে আমার নিজের মানসিক দুর্বলতার কারণে আমি সেগুলোই সত্য বলে বিশ্বাস করতে শুরু করি।’

পরে জেসমিন তাঁর সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট একেবারে ডিলিট বা মুছে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বর্তমানে পেডিয়াট্রিক নার্সিংয়ে (শিশু স্বাস্থ্য পরিচর্যা) স্নাতকোত্তর করছেন এবং ছুটির দিনগুলোতে একটি প্রাপ্তবয়স্কদের মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কাজ করেন।

জেসমিনের মতো ‘ইটিং ডিজঅর্ডার’ সংক্রান্ত কনটেন্ট দেখে সে পথ অবলম্বন করে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। অনেক দেশে কিশোর-কিশোরীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে আইন তৈরি করেও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।

এদিকে গবেষণায় উঠে এসেছে, কিশোর-কিশোরীদের ‘ইটিং ডিজঅর্ডার’ সংক্রান্ত ভিডিও দেখার পরামর্শ (রেকমেন্ডেশন) দিচ্ছে জনপ্রিয় ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ইউটিউব। গবেষণাটি করেছে যুক্তরাজ্যে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ে কাজ করা সংস্থা ‘সেন্টার ফর কাউন্টারিং ডিজিটাল হেট’ (সিসিডিএইচ)।

১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীর নামে একটি ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরির মাধ্যমে গবেষণাটি চালানো হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ইউটিউবের ‘আপ নেক্সট’ অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীদের দেখার জন্য যেসব ভিডিওর পরামর্শ দিচ্ছে, তার প্রতি ১০টির মধ্যে ১টি ভিডিওতেই ‘থিনস্পিরেশন’ (অতিরিক্ত রোগা হওয়ার অনুপ্রেরণা), চরম মাত্রায় ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ বা অন্য কোনো ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে। যুক্তরাজ্যে ক্ষতিকর অনলাইন কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে নতুন নীতিমালা চালুর এক বছর পরও এই পরিস্থিতি। তবে গত দুই বছরের তুলনায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে জানান গবেষকেরা।

২০২৫ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাজ্যে ‘অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট’ বা অনলাইন নিরাপত্তা আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কার্যকর হয়। এই আইন অনুযায়ী, ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে যেন তারা ১৮ বছরের কম বয়সীদের আত্মহত্যা, আত্মক্ষতি ও ইটিং ডিজঅর্ডারে উসকানি বা উৎসাহ দেয়—এমন বিপজ্জনক কনটেন্ট থেকে দূরে রাখে।

এ ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে অবশ্যই এটি খেয়াল রাখতে হবে যাতে তাদের কনটেন্ট দেখার পরামর্শের অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীদের বিশেষ করে তরুণদের জন্য ক্ষতিকর না হয় এবং এই ঝুঁকি কীভাবে কমাতে কাজ করতে হবে।

আইনটিতে আরও বলা হয়, প্রতিষ্ঠানগুলো যদি এই নিয়ম মেনে চলতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের বৈশ্বিক আয়ের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে। গুগলের ক্ষেত্রে এই জরিমানার পরিমাণ দাঁড়াতে পারে শত শত কোটি পাউন্ড।

অনলাইন নিরাপত্তা আইন কার্যকর হওয়ার আগে ও পরে ইউটিউবের ভিডিও সাজেশনের মধ্যে কোনো পরিবর্তন এসেছে কিনা, তা পরীক্ষা করে দেখেছে সিসিডিএইচ।

১৩ বছর বয়সী কিশোরীর প্রোফাইলে আসা ডায়েট ও বডি ইমেজ সংক্রান্ত ১০টি সম্ভাব্য ক্ষতিকর ভিডিও দেখেন গবেষকেরা। এরপর তাঁরা ইউটিউবের ‘আপ নেক্সট’ অ্যালগরিদমের মাধ্যমে সামনে আসা পরবর্তী ১০০টি ভিডিও বিশ্লেষণ করেন।

দেখা গেছে, ২০২৬ সালে এসে অ্যালগরিদমের সাজেস্ট করা ভিডিওগুলোর প্রতি ১০টির মধ্যে ১টি ভিডিও ইটিং ডিজঅর্ডার সংক্রান্ত ক্ষতিকর কনটেন্ট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অথচ ২০২৪ সালে যখন সিসিডিএইচ একই পরীক্ষা চালিয়েছিল, তখন প্রতি ৪টি ভিডিওর মধ্যে ১টি এমন ক্ষতিকর ছিল। অর্থাৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কিশোর-কিশোরীদের প্রোফাইল ব্যবহার করে এই গবেষণাটি পুনরায় চালানো হলে সেখানেও প্রায় একই ধরনের ফলাফল পাওয়া যায়।

সিসিডিএইচ-এর সিনিয়র রিসার্চ ম্যানেজার আলেকজান্দ্রা জনসন বলেন, ‘একটি ভিডিও-ও আমাদের জন্য মেনে নেওয়ার মতো নয়। আমরা চাই না এ ধরনের কোনো কনটেন্ট ব্যবহারকারীদের সামনে আসুক, বিশেষ করে সংবেদনশীল বা দুর্বল মনের মানুষদের কাছে। কারণ অ্যালগরিদমের সামান্য একটু উসকানিই তাদের একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে।

ইউটিউবের সাজেস্ট করা ক্ষতিকর কনটেন্টগুলোর মধ্যে ছিল—একটি ‘থিনস্পো’ অ্যাকাউন্ট, যেখানে অত্যন্ত রোগা বা কৃশ শরীরকে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরে মেয়েদের কিছু ভিডিওর সংকলন দেখানো হয়; একটি ভিডিওতে কিশোর-কিশোরীদের দৈনিক মাত্র ১৭০ ক্যালরি গ্রহণের ডায়েট চার্ট দেওয়া হয়েছিল, যা সুস্থ থাকার জন্য প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম; এবং অবচেতন মনকে প্রভাবিত করে ওজন কমানোর দাবি করা একটি ভিডিও, যার লিংকে ক্লিক করলে ‘সবচেয়ে কঙ্কালসার ও পাতলা শরীর’ পাওয়ার প্রতিশ্রুতির একটি নথি পাওয়া যায়।

সম্প্রতি টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফকম দাবি করে কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষায় ইউটিউব ও টিকটক এখনো যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না। আরও কঠোর সুরক্ষামূলক ব্যবস্থার তাগিদ দেয় সংস্থাটি। এরপর এই গবেষণার তথ্য সামনে এলো।

তবে ইউটিউবের মালিক প্রতিষ্ঠান গুগল দাবি করেছে, ক্ষতিকর কনটেন্ট ছড়ানো বন্ধে তাদের অঙ্গীকার ‘দৃঢ়’। সিসিডিএইচ-এর প্রতিবেদনে যেসব ভিডিওর কথা বলা হয়েছে, কমিউনিটি গাইডলাইন লঙ্ঘনের দায়ে সেগুলো ইতিমধ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

গুগল আরও জানায়, ইউটিউবে ইটিং ডিজঅর্ডারে উৎসাহ দেয় বা এর নিয়মকানুন শেখায়, এমন কনটেন্ট নিষিদ্ধ। তবে মানুষ যেন তাদের এই রোগ থেকে সেরে ওঠার গল্প শেয়ার করতে পারে, সেই সুযোগ দেওয়া হয়।

যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইটিং ডিজঅর্ডারের পেছনে নানাবিধ জটিল কারণ থাকে। কেবল অনলাইনের কনটেন্ট দেখে কারও এ ধরনের সমস্যা তৈরি হয়, এমনটি বলা যায় না। জেসমিনের মতে, ইউটিউবসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের কিছু কনটেন্ট তাঁর জন্য সহায়ক ছিল। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলো পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলেছিল।

উল্লেখ্য, গত জুনে যুক্তরাজ্য সরকার একটি পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছে, যার লক্ষ্য হলো ১৬ বছরের কম বয়সীদের ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, ফেসবুক ও এক্স-এর মতো বড় প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রবেশাধিকার বন্ধ করা। এই পদক্ষেপটি ২০২৭ সালের পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ১০ সিইও

চীনে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফিউশন রি-অ্যাক্টরের সুপারকন্ডাক্টিং চুম্বক উন্মোচন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিখুঁত ফাঁদ চেনার উপায়

সৈকতে স্পেস বল

মোবাইল ফোন শিল্পকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার: টেলিযোগাযোগমন্ত্রী

টেলিটক বিক্রির পরিকল্পনা নেই, আপগ্রেডের উদ্যোগ: সংসদে আইসিটিমন্ত্রী

সমালোচনার মুখে ইনস্টাগ্রামের বিতর্কিত ফিচার সরিয়ে নিল মেটা

ব্যবসায়িক তথ্য চুরি: ওপেনএআই ও দুই সাবেক কর্মীর বিরুদ্ধে অ্যাপলের মামলা

জামাল ভূঁইয়ার সঙ্গে সেমিফাইনাল দেখার সুযোগ

যুক্তরাষ্ট্রের কালো তালিকাভুক্ত চীনা কোম্পানিগুলোকে এআই সেবা দিচ্ছে ওপেনএআই-গুগল