যুক্তরাজ্যের ১৬ ও ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের জন্য রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ওপর ‘কারফিউ’ বা সান্ধ্য আইন জারির ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সরকার। তবে তরুণেরা চাইলে তাদের অ্যাকাউন্টের সেটিংস পরিবর্তন করে এ নিষেধাজ্ঞা এড়াতে পারবে।
নতুন এ নিয়ম অনুযায়ী—ইনস্টাগ্রাম, টিকটক এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় অ্যাপগুলো ডিফল্ট বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মধ্যরাত থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত ১৬ ও ১৭ বছর বয়সীদের জন্য বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় থাকবে।
একই সঙ্গে সরকার সোশ্যাল মিডিয়ার ‘অটো-প্লে’ (স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিও চালু হওয়া) এবং ‘ইনফিনিট স্ক্রল’-এর (টানা স্ক্রল করার ফিচার) মতো আসক্তিমূলক ফিচারগুলোও বন্ধ রাখার প্রস্তাব করেছে। সরকারের দাবি, এই কারফিউ ও নতুন বিধিনিষেধের ফলে তরুণদের পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়বে, ঘুমের মান উন্নত হবে এবং পারিবারিক বন্ধন আরও সুদৃঢ় হবে।
তবে সমালোচকেরা এই প্রস্তাবকে অত্যন্ত ‘খাপছাড়া’ এবং শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি ‘হাতছাড়া হয়ে যাওয়া সুযোগ’ বলে বর্ণনা করেছেন।
এর আগে গত জুন মাসে যুক্তরাজ্যে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য বেশ কিছু সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
যুক্তরাজ্যের প্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রী লিজ কেন্ডাল বলেন, ‘তরুণদের প্রয়োজনীয় ঘুম নিশ্চিত করতে, স্কুল ও কলেজে মনোযোগ দিতে এবং পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে গুণগত সময় কাটাতে এই পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমরা চাই তরুণেরা প্রযুক্তির সুফল ভোগ করুক, তবে একই সঙ্গে তাদের এমন একটি অনলাইন পরিবেশ দেওয়া প্রয়োজন যেখানে তারা নিরাপদে বিকশিত হতে পারে।’
বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টির শ্যাডো এডুকেশন সেক্রেটারি লরা ট্রট সরকারের এই পরিকল্পনাকে একটি ‘জগাখিচুড়ি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘সরকার হয় ভাবুক ১৬ ও ১৭ বছর বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা উচিত, আর না হয় ভাবুক উচিত নয়। কিন্তু এমন কারফিউ যা চাইলেই তরুণেরা বন্ধ করে দিতে পারে, তা দিয়ে কিছুই অর্জন করা যাবে না।’
শিশু সুরক্ষাবিষয়ক দাতব্য সংস্থা ‘মলি রোজ ফাউন্ডেশন’-এর প্রধান নির্বাহী অ্যান্ডি বারোজ সরকারের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেন, ‘আমরা অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সী কিশোর-কিশোরীদের জন্য এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেও, এটি আসলে আরেকটি খাপছাড়া ঘোষণা মাত্র। শিশুদের সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্য যে ধরনের সমন্বিত পরিকল্পনার প্রয়োজন ছিল, এটি তা নয়।’
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের (এলএসই) শিশু অধিকার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সোনিয়া লিভিংস্টোন সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই কারফিউ ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের ক্ষতি করতে পারে। বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘রাতে কোম্পানিগুলো যাতে পুশ নোটিফিকেশন পাঠিয়ে কারও ঘুম ভাঙাতে না পারে, সে জন্য কারফিউ জারি করা চমৎকার বিষয়। কিন্তু রাতে কোনো অসহায় শিশু যখন মানসিক সাহায্য, সান্ত্বনা বা সমর্থনের জন্য তার বিশ্বস্ত কোনো মাধ্যমে যোগাযোগ করতে চাইবে, তখন এই কারফিউ যদি তাকে বাধা দেয়, তবে তা অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে।’
ইংল্যান্ডের চিলড্রেনস কমিশনার ডেম রেচেল ডি সুজা বলেন, ‘আমাদের তরুণদের কথা শুনতে হবে। তারা পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা চায় না, তবে তারা আসক্তিমূলক ইনফিনিট স্ক্রলিং থেকে সুরক্ষা চায়।’ তিনি এই কারফিউ কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চান এবং শিশুদের সুরক্ষায় দেশটির গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফকমের সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহারের তাগিদ দেন।
এই নীতি চূড়ান্ত করার আগে যুক্তরাজ্য সরকার কিছু পরিবারের ওপর পরীক্ষামূলক গবেষণা চালায়। গবেষণার অংশ হিসেবে ৩০০ জন কিশোর-কিশোরীর ওপর এক মাস ধরে তিন ধরনের সমীক্ষা চালানো হয়:
গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত এই গবেষণার প্রতিবেদনে সরকার জানায়, রাতে কারফিউ দেওয়ার বিষয়টি কিশোর-কিশোরীদের ঘুমের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী প্রমাণিত হয়েছে। এর ফলে রাতে পারিবারিক বন্ধন ও যোগাযোগ যেমন বেড়েছে, তেমনি বাবা-মায়েদের জন্যও এটি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ ছিল।
তবে বাথ স্পা ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞান যোগাযোগ বিষয়ের অধ্যাপক পিট এচেলস এই গবেষণার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘এটি খুবই ছোট আকারের একটি গবেষণা। ব্যবহারিক ক্ষেত্রে শিশু ও অভিভাবকেরা প্রযুক্তির এই বিধিনিষেধগুলো কীভাবে সামাল দেবেন, তা বোঝার জন্য এটি সামগ্রিক বিষয়ের একটি ছোট অংশ মাত্র।’
যুক্তরাজ্যের এই নতুন প্রস্তাব মূলত অস্ট্রেলিয়ার পদক্ষেপের অনুরণন। অস্ট্রেলিয়ায় গত ডিসেম্বর থেকে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং প্ল্যাটফর্মগুলোকে কিশোর-কিশোরীদের অ্যাকাউন্ট বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে সমালোচকদের দাবি, অস্ট্রেলিয়ায় এই নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি এবং অনেক শিশু এখনো ওই সাইটগুলো ব্যবহার করছে। ফলে যুক্তরাজ্যেও এর কার্যকারিতা এবং বয়স যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পাশাপাশি, শিশুরা ভিপিএন ব্যবহার করে এই বিধিনিষেধ ফাঁকি দিতে পারে কিনা—তা নিয়েও বিতর্ক ছিল। তবে সরকার কর্তৃক পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স ফাঁকি দিতে শিশুদের ভিপিএন ব্যবহারের হার খুবই নগণ্য।
সরকার জানিয়েছে, তারা ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এই নতুন বিলটি পার্লামেন্টে উত্থাপন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা আগামী বছরের বসন্তকাল থেকে কার্যকর হতে পারে।