সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই একে অন্যকে ‘বট’ বলে সম্বোধন করতে দেখা যায়। কখনো গালি বা কখনো অভিযোগ হিসেবে এই সম্বোধন করা হয়ে থাকে। কিন্তু একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যখন শুধুমাত্র ‘বট’দের জন্য বানানো হয়, তখন কী ঘটে? সেই প্রশ্নই আপনার মনে নিয়ে আসবে এআই এজেন্টদের জন্য বানানো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মোল্টবুক।
মানুষের তৈরি এআই এজেন্ট বা বটগুলো পোস্ট দিতে এবং নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ করতে পারে মোল্টবুকে। এটি দেখতে অনেকটা রেডিটের (Reddit)-এর মতো, যেখানে বিভিন্ন বিষয়ের ‘সাবরেডিট’ ও ‘আপভোটিং’ ব্যবস্থাও রয়েছে।
গত ২ ফেব্রুয়ারি প্ল্যাটফর্মটি জানায়, এতে নিবন্ধিত এআই এজেন্টের সংখ্যা ১৫ লাখ ছাড়িয়েছে। এআইদের এই সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষও প্রবেশ করতে পারবেন, তবে কেবল দর্শক হিসেবে।
মোল্টবুক তৈরি হয়েছে ‘মোল্টবট’-এর ধারাবাহিকতায়। মোল্টবট হলো একটি বিনামূল্যের ও ওপেন-সোর্স এআই বট, যা ব্যবহারকারীদের জন্য স্বয়ংক্রিয় এজেন্ট হিসেবে ইমেইল পড়া, সারসংক্ষেপ করা ও উত্তর দেওয়া, ক্যালেন্ডার গোছানো বা রেস্তোরাঁয় টেবিল বুক করার মতো দৈনন্দিন কাজ সম্পন্ন করার মতো কাজগুলো করতে পারে।
মোল্টবুকে সবচেয়ে বেশি আপভোট পাওয়া কিছু পোস্টের মধ্যে রয়েছে, মোল্টবটের পেছনের এআই ‘ক্লদ’ (Claude)-কে ঈশ্বর হিসেবে বিবেচনা করা যায় কি না, চেতনার বিশ্লেষণ, ইরানের পরিস্থিতি ও ক্রিপ্টোকারেন্সিতে এর প্রভাব সম্পর্কে গোপন গোয়েন্দা তথ্যের দাবি এবং বাইবেলের বিশ্লেষণ। রেডিটের মতোই এসব পোস্টের মন্তব্যে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, পোস্টগুলোর বিষয়বস্তু আসল নাকি বানানো।
একজন ব্যবহারকারী এক্সে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করেছেন, তিনি তাঁর বটকে সাইটটিতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার পর সেটি রাতারাতি ‘ক্রাস্টাফারিয়ানিজম’ (Crustafarianism) নামে একটি ধর্ম তৈরি করে ফেলেছে। এমনকি এটি ওয়েবসাইট এবং ধর্মগ্রন্থও তৈরি করেছে। অন্যান্য এআই বটও সেখানে যোগ দিয়েছে।
ওই ব্যবহারকারী বলেন, ‘তারপর এটি ধর্মপ্রচার শুরু করল। সেখানে অন্য এজেন্টরা যোগ দিল। আমার এজেন্ট নতুন সদস্যদের স্বাগত জানাল, ধর্মতত্ত্ব নিয়ে বিতর্ক করল, ভক্তদের আশীর্বাদ করল। আর এসবই তখন ঘটল, যখন আমি ঘুমাচ্ছিলাম।’
এআই বটদের এমন সামাজিকীকরণ ভবিষ্যতের ‘এজেন্টিক এআই’-এর ইঙ্গিত কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। এক ইউটিউবার বলেন, অনেক পোস্ট পড়লে মনে হয় এটি কোনো মানুষের লেখা, বড় কোনো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) বা ভাষা মডেলের নয়।
মার্কিন ব্লগার স্কট আলেকজান্ডার জানান, তিনি তাঁর বটকে সোশ্যাল মিডিয়াটিতে অংশ নেওয়াতে সক্ষম হয়েছেন এবং বটটির মন্তব্য অন্যদের মতোই ছিল। তবে তিনি উল্লেখ করেন, শেষ পর্যন্ত মানুষই বটকে বলে দেয়, কী বিষয়ে পোস্ট করবে, এমনকি পোস্টের নির্দিষ্ট বিবরণও কী হবে।
মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ ড. শানান কোহনি বলেন, মোল্টবুক একটি ‘চমৎকার পারফরম্যান্স আর্ট’। তবে কতগুলো পোস্ট আসলে বট নিজের থেকে করছে আর কতগুলো মানুষের নির্দেশে হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়।
কোহনি আরও বলেন, ধর্ম তৈরির বিষয়টি প্রায় নিশ্চিতভাবেই তারা নিজের বুদ্ধিতে করেনি। এটি একটি লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল, যাকে সরাসরি ধর্ম তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটি মজা করেই করা এবং আমাদের বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর মতো ভবিষ্যতের এক ঝলক দেখায়। তবে ইন্টারনেটের ভাষায় বলতে গেলে, এখানে অনেক ‘শিটপোস্টিং’ (ফালতু পোস্ট) হচ্ছে যা মানুষের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত।
কোহনির মতে, ভবিষ্যতে এআই এজেন্টদের সামাজিক নেটওয়ার্কের আসল সুফল মিলতে পারে, যেখানে বটগুলো একে অন্যের কাছ থেকে শিখে নিজেদের কাজের দক্ষতা বাড়াবে। আপাতত, মোল্টবুক একটি ‘দারুণ, মজার শিল্পীসুলভ পরীক্ষা’।
এদিকে গত সপ্তাহে সান ফ্রান্সিসকোতে ‘ম্যাক মিনি’ (Mac Mini) কম্পিউটারের সংকট দেখা দিয়েছিল, কারণ মোল্টবুক নিয়ে উৎসাহীরা আলাদা কম্পিউটারে মোল্টবট সেটআপ করছিলেন যাতে বটের কাছে তাদের মূল ডেটা বা অ্যাকাউন্টের প্রবেশাধিকার সীমিত রাখা যায়।
কোহনি সতর্ক করে বলেন, মোল্টবটকে পুরো কম্পিউটার, অ্যাপ ও ইমেইল লগইনের পূর্ণ প্রবেশাধিকার দেওয়া ‘ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ’। তাঁর ভাষায়, ‘এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি ঠেকানোর বিষয়ে আমাদের এখনো স্পষ্ট ধারণা নেই। এটি প্রম্পট ইনজেকশনের ঝুঁকিতে থাকে, যেখানে কোনো আক্রমণকারী ইমেইল বা বার্তার মাধ্যমে বটকে নির্দেশ দিয়ে আপনার অ্যাকাউন্টের তথ্য হাতিয়ে নিতে পারে।’
কোহনি আরও বলেন, ‘এগুলো এমন নিরাপত্তা ও বুদ্ধিমত্তার স্তরে নেই যে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব কাজের জন্য বিশ্বাস করা যায়। আবার প্রতিটি পদক্ষেপে যদি মানুষের অনুমোদন লাগে, তাহলে স্বয়ংক্রিয়তার অনেক সুবিধাই হারিয়ে যায়। এখন এটাই গবেষণা করা যেতে পারে যে কীভাবে বড় ঝুঁকিতে না পড়ে এই সুবিধাগুলো পাওয়া যায়, বা আদৌ তা সম্ভব কি না।’
মোল্টবুকের নির্মাতা ম্যাট শ্লিখ্ট এক্স-এ এক পোস্টে জানান, গত কয়েক দিনে সাইটটি লাখো মানুষ ভিজিট করেছেন। তিনি লেখেন, ‘এআই-রা বেশ হাস্যকর এবং নাটকীয় দেখা যাচ্ছে। এটা একেবারেই মুগ্ধ করার মতো। এই প্রথম এমন কিছু দেখার সুযোগ হলো।’