পুরুষের বেশ ধরে রাস্তায় নামতে হয়েছে, মাথার দিকে ছোড়া হয়েছে পাথর, বোতল; শেষ পর্যন্ত নিজের দেশই ছাড়তে হয়েছে সাইক্লিংয়ের স্বপ্ন পূরণে। আফগানিস্তানের ২৩ বছর বয়সী ফারিবা হাশিমির কাছে এশিয়ান গেমসে নারীদের ব্যক্তিগত টাইম ট্রায়ালে সপ্তম হওয়া তাই শুধু একটি ফল নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর জীবনের গভীর এক গল্প।
২০২১ সালে তালিবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ফেরার পর দেশ ছাড়েন হাশিমি। এখন ইতালিতে বসবাস করছেন তিনি। নিজ দেশে প্রায় ২৪ লাখ আফগান কিশোরী মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউনেসকো। এমন বাস্তবতায় হাশিমি চান, তাঁর যাত্রার গল্প দেশের মেয়েদের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠুক।
হাশিমি বলেন, ‘আমার কাছে এটা শুধু আমার পারফরম্যান্সের বিষয় নয়। এই পরিস্থিতিতেও একজন আফগান নারী কী করতে পারে, সেটা আমার দেশের মানুষকে দেখানোই আমার লক্ষ্য। আমরা এখনো বেঁচে আছি এবং এখনো লড়ে যাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি আশা করি, কিছু একটা বদলাবে। তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের মেয়েরা দেশের ভেতর থেকেই এশিয়ান গেমসে অংশ নিতে পারবে, পৃথিবী দেখতে পারবে এবং পদক জিততে পারবে।’
আন্তর্জাতিক সাইক্লিস্ট বোন ইউলদুজ হাশিমিকে দেখে ১৫ বছর বয়সে সাইক্লিংয়ে আসেন হাশিমি। কিন্তু আফগানিস্তানের ফারিয়াব প্রদেশে এই খেলাটাই তাঁর জন্য হয়ে ওঠে ভয় আর ঝুঁকির পথ।
হাশিমির ভাষায়, ‘অনুশীলনে যাওয়ার সময় আমি সব সময় পুরুষের পোশাক পরতাম। দুই-তিনটি আলাদা মুখোশ ব্যবহার করতাম, যাতে কেউ আমাকে চিনতে না পারে বা আক্রমণ করতে না পারে। ওরা আমাকে খুঁজে পাবে—এটা নিয়ে আমি ভয় পেতাম। কখনো কখনো আমার মাথা লক্ষ্য করে বড় পাথর ছোড়া হয়েছে। মানুষ বোতলও ছুড়েছে। আমাদের ভয় দেখিয়ে বাড়ি ফেরানোর চেষ্টা করত, আক্রমণ করত।’
সেই সময়টাকে জীবনের সবচেয়ে খারাপ অভিজ্ঞতাগুলোর একটি উল্লেখ করে হাশিমি অবশ্য নিজের দেশের মানুষকে খারাপ বলতে চান না। তাঁর কথায়, ‘আমার সময়টা খুব খারাপ কেটেছে। তবে আমি বলছি না, আমার দেশের মানুষ খারাপ। আমাদের দেশটা অসাধারণ। কিন্তু মানুষের মানসিকতা আলাদা।’
১৯৯৭ সালের বিশ্ব রোড সাইক্লিং চ্যাম্পিয়ন আলেসান্দ্রা কাপেলোত্তোর সহায়তায় পরে ইতালিতে পাড়ি জমান হাশিমি। দুই বোনই দুই বছর আগে প্যারিস অলিম্পিকে অংশ নেন।
নিজের দেশ থেকে দূরে থাকার কষ্টটাও ভুলতে পারেননি হাশিমি। তিনি বলেন, ‘আমি নিজের দেশে থাকতে পারি না, এটা খুবই দুঃখের। অনেক দিন ধরে আমি আমার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে পারিনি। স্বপ্নটা পূরণ করতে আমি আমার দেশ ছেড়েছি। মানুষের ছোড়া পাথর এড়িয়ে পালিয়েছি।’
তবে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন এখনো তাঁর ভেতরে বেঁচে আছে। হাশিমি বলেন, ‘ভবিষ্যতে আমি সত্যিই আমার দেশের ভেতরে কিছু পরিবর্তন আনতে চাই। দেশে ফিরে আমার মানুষকে অনুপ্রাণিত করাই আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।’