চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে মাঠে নামার আগেই একটা লড়াই শেষ হয়ে গেছে — ক্লান্তির লড়াই। বুদাপেস্টের পুসকাস অ্যারেনায় শনিবার রাতে আর্সেনাল ও প্যারিস সেইন্ট জার্মেই যখন মুখোমুখি হবে, তখন দুটি দলের পায়ের নিচে থাকবে সম্পূর্ণ আলাদা দুটি মৌসুমের ভার।
আর্সেনালের জন্য এটি মৌসুমের ৬৩তম ম্যাচ। এপ্রিলের শুরু পর্যন্ত চারটি ট্রফির দৌড়ে ছিল মিকেল আর্তেতার দল। প্রিমিয়ার লিগ, এফএ কাপ, লিগ কাপ, চ্যাম্পিয়নস লিগ —ফলে শরীরের ওপর এক নিষ্ঠুর চাপও বয়ে নিতে হয়। শেষ পর্যন্ত লিগ শিরোপাটা এসেছে, ২২ বছরের অপেক্ষার অবসান হয়েছে, কিন্তু তার মূল্য দিতে হয়েছে হাড়ে হাড়ে।
পিএসজির গল্পটা আলাদা। লুইস এনরিকে এই মৌসুমকে দেখেছেন একটিমাত্র লক্ষ্যের দিক থেকে— চ্যাম্পিয়নস লিগ ধরে রাখা। লিগ ওয়ান তাঁর কাছে ছিল অনেকটা মহড়ার মঞ্চ। কাতারি মালিকানার বিপুল অর্থে গড়া গভীর স্কোয়াড ব্যবহার করে তিনি মূল খেলোয়াড়দের লিগে বিশ্রাম দিয়েছেন, ইউরোপের রাতগুলোর জন্য তাঁদের রেখেছেন তরতাজা করে। ফলে পিএসজির মূল একাদশ ফাইনালে নামছে অনেকটাই সতেজ হয়ে, আর্সেনালের তুলনায় লিগে প্রায় সাত হাজার মিনিট কম পায়ে নিয়ে।
সংখ্যাগুলো দেখলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। অধিনায়ক মার্কিনিওস পুরো মৌসুমে লিগে খেলেছেন মাত্র ১৪টি ম্যাচ, অথচ চ্যাম্পিয়নস লিগে শুরু করেছেন ১৪টিতেই। ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯ এপ্রিল — এই দুই মাসেরও বেশি সময় তিনি লিগে একটি মিনিটও খেলেননি, টানা সাত ম্যাচে ছিলেন বেঞ্চে বসেছিলেন। অথচ একই সময়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে ছয়টি ম্যাচের প্রতিটি মিনিট খেলেছেন। উসমান দেম্বেলে ২২ লিগ ম্যাচে পুরো ৯০ মিনিট খেলেছেন মাত্র একবার। খাভিচা কাভারাৎসখেলিয়া ২৮ ম্যাচে পুরো সময় মাঠে ছিলেন মাত্র দুবার। তারাই ফাইনালে পিএসজির আক্রমণের মূল অস্ত্র।
বিপরীতে আর্সেনালের একাদশ মৌসুমের দীর্ঘ যাত্রার সাক্ষী। ডেভিড রায়া মৌসুমের শেষ দিনে বিশ্রাম পাওয়ার আগ পর্যন্ত গোলপোস্টের সামনে দাঁড়িয়েছেন প্রতিটি মিনিট। ডেকলান রাইস, উইলিয়াম সালিবা, গ্যাব্রিয়েল, মার্টিন জুবিমেন্দি — প্রত্যেকে লিগে অন্তত ৩০টি ম্যাচের শুরুর একাদশে ছিলেন। পিএসজির হয়ে ওয়ারেন জায়ের-এমেরি লিগে খেলেছেন ২ হাজার ৪৫৩ মিনিট। আর্সেনালের ছয়জন খেলোয়াড় তাঁর চেয়েও বেশি সময় মাঠে ছিলেন।
এনরিকে এই পরিকল্পনাকে বলেছিলেন ‘টেট্রিস’।এর জন্য প্রত্যেক খেলোয়াড়ের সঙ্গে আলাদা কথা বলতে হয়। সেই টেট্রিস এখন পর্যন্ত নিখুঁতভাবে মিলেছে। লিগ জেতা হয়েছে, চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে পৌঁছানো হয়েছে। তবে ছোট ফাটলও আছে। চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচের পরপরই লিগে তিনটি হার এসেছে। মাঝারি মানের প্যারিস এফসির কাছে হেরে লিগে মৌসুম শেষ হয়েছে।
সময়ের হিসাবেও পিএসজি এগিয়ে। ১৭ মে শেষ ম্যাচ খেলেছে তারা, ফাইনালের আগে তারা সময় পাচ্ছে ১৩ দিন। আর্সেনালের বিশ্রাম মাত্র ছয় দিন। ২২ মে লিগের শেষ ম্যাচে ক্রিস্টাল প্যালেসকে হারানোর পর থেকেই গানাররা প্রস্তুতিতে নেমেছেন, কিন্তু সময় তাদের পক্ষে নেই।
তবু ইতিহাস বলে, ফুটবলে পরিসংখ্যান শেষ কথা বলে না। গত মৌসুমে পিএসজি ৫৮ ম্যাচ খেলেও চারটি ট্রফি জিতেছিল — সেই যাত্রায় সেমিফাইনালে আর্সেনালকে দুই লেগ মিলিয়ে হারিয়েছিল ৩-১ গোলে।
চ্যাম্পিয়নস লিগে পিএসজি এগিয়ে থাকছে তাই কিছুটা। কিন্তু আর্সেনালের হাতে আছে সেই ক্ষুধা, যেটা ২২ বছরের অপেক্ষা শেষে লিগ জেতা একটি দলের চোখে জ্বলে। ক্লান্ত শরীর আর সতেজ মনের এই লড়াইয়ের ফয়সালা হবে শনিবার রাতে বুদাপেস্টে।