রাজধানীর নাখালপাড়ার বাসিন্দা মো. আসাদ ৪০ পেরিয়েছেন। কয়েক দশক আগেও এলাকাটিতে উন্মুক্ত স্থানের অভাব ছিল না। এই প্রতিবেদক আসাদের শৈশবের খেলাধুলার কথা জানতে চাইলে একটু স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন তিনি। জানালেন, নব্বইয়ের দশকে বিকেলে স্কুল থেকে ফিরেই যেতেন খেলার মাঠে। অনেকটা সময় ফুটবল বা ক্রিকেটে মেতে থেকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে বাড়ি ফিরতেন।
এখন সেই নাখালপাড়ায় মো. আসাদের সন্তানেরা ইট-কাঠের গরাদে বন্দী। এলাকায় পর্যাপ্ত খেলার সুযোগ নেই। নেই খোলামেলা জায়গা, যেখানে অন্তত শিশু-কিশোরেরা ছোটাছুটি করতে পারে। শিশুরা তাই মোবাইল ফোনের ভিডিও বা গেমসে মগ্ন। শিশু-কিশোরদের মধ্যে মুটিয়ে যাওয়ার সমস্যা বা তরুণদের মাদকে বা কিশোর গ্যাংয়ে জড়ানোর পেছনে খেলাধুলার সুযোগ না থাকাকে একটা বড় কারণ মনে করেন আসাদ।
ঢাকা শহরজুড়ে এখন কমবেশি একই চিত্র। দ্রুত নগরায়ণের চাপে হারিয়ে গেছে খোলা জায়গা ও খেলার মাঠ। জমির দাম বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় এক ইঞ্চি মাটিও ফাঁকা রাখতে চায় না কেউ। আর সরকারি মাঠ বা ছোট পার্ক যা-ও আছে, তা অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহার উপযোগী থাকে না। ফ্ল্যাটবাড়ির এই সময়ে হারিয়ে গেছে আঙিনা। নিচের তলা পরিণত হয়েছে গ্যারেজে। মাঠহীনতার এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীতে দেখা যাচ্ছে নতুন এক ব্যবসায়িক উদ্যোগ। কৃত্রিম ঘাসের মাঠ তৈরি করে তাতে অর্থের বিনিময়ে খেলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে আগ্রহীদের। শহরের অসংখ্য শিশু-কিশোরের প্রয়োজনের তুলনায় এই উদ্যোগ এখনো নিতান্তই সীমিত। তবে ধীরে ধীরে কৃত্রিম টার্ফের সংখ্যা বাড়ছে। বাধ্য হয়ে সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা সেখানে যাচ্ছেন।
বেসরকারি সংস্থা ওয়ার্ক ফর আ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট (ডব্লিউবিবি) বলছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ১২৯ ওয়ার্ডের মধ্যে ৪১টিতে কোনো খেলার মাঠ নেই। রাজউকের আলোচিত মহাপরিকল্পনা ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) অনুযায়ী প্রতি সাড়ে ১২ হাজার বাসিন্দার জন্য ২ থেকে ৩টি খেলার মাঠ থাকা উচিত। সেই হিসাবে রাজধানীতে প্রয়োজন আট শরও বেশি মাঠ।
রাজধানীর দক্ষিণ-পূর্বের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা খিলগাঁওয়ের জোড়পুকুরে মাত্র একটি মাঠ। বিকেল ও সন্ধ্যায় বহু খেলোয়াড়ের ভিড় হয় সেখানে। খেলার সুযোগ পেতে অনেকে সকাল বা দুপুরেও আসে। বাগিচা এলাকার বাসিন্দা তরুণ সাজিদ চৌধুরী জোড়পুকুর মাঠে খেলছিলেন বন্ধুদের সঙ্গে। তিনি জানান, মাঠে একসঙ্গে আটটি দল ছোট পরিসরে খেলতে পারে। এলাকার এত মানুষের জন্য একটি মাঠ যথেষ্ট নয়।
মোহাম্মদপুর শহীদ পার্ক খেলার মাঠেরও একই অবস্থা। অনেক ছেলে জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সেখানে।
ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের প্রকল্প ব্যবস্থাপক নাঈমা আকতার বলেন, ‘শিশুরা গৃহবন্দী হয়ে পড়েছে। টেলিভিশন-মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে শারীরিক সক্রিয়তা হারাচ্ছে। শুধু শিশুরা নয়, বয়োজ্যেষ্ঠ এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষেরাও দীর্ঘ সময় বাড়িতে অনেকটা বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করছেন।’
কলাবাগানের তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক ও উন্নয়নকর্মী সৈয়দা রত্না বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নতুন মাঠ করা ও পুরোনো মাঠ রক্ষার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে এখনো কার্যকর কিছু দেখিনি।’
মাঠ-সংকটের কারণে ঢাকায় বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠছে কৃত্রিম ঘাসের মাঠ বা টার্ফ। এগুলো বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্যমতে, ঢাকায় প্রায় ১০০ টার্ফ গড়ে উঠেছে। সেখানে দিনে ও রাতে বিভিন্ন বয়সের মানুষ খেলাধুলা করে। সকাল-সন্ধ্যা কাজের মধ্যে ডুবে থাকা তরুণ-যুবক কর্মজীবীরা অনেকে অফিস শেষে বিনোদনের জন্য টার্ফে ঢুঁ মারছেন। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগের কর্মী তানজিম হাসান তাঁদের একজন। ছোটবেলায় ফুটবল খেলায় মেতে থাকতেন। টার্ফে এসে সেই শৈশব যেন ফিরে পান। অফিস শেষে বন্ধুদের সঙ্গে যোগ দেন খেলায়। তানজিম বলেন, ‘খেলা আমাকে প্রশান্তি দেয়। এমন শান্তি আর কোথাও পাই না। কয়েক দিন টার্ফে যাওয়ার পর অনেকের সঙ্গেই পরিচয় হয়েছে। অফিস শেষে সপ্তাহে অন্তত দুই দিন সন্ধ্যায় খেলি।’
কলাবাগানের মো. আজহারুল ইসলাম বন্ধুদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে টার্ফে ফুটবল খেলেন। তিনি বলেন, ‘এলাকায় খেলার ভালো মাঠ নেই। তাই টার্ফই এখন ভরসা।’
ঢাকায় বিভিন্ন এলাকায় তৈরি হয়েছে নানান নামের খেলার টার্ফ। আফতাবনগরে হয়েছে ট্যাকেল গ্রাউন্ড, ইস্ট কোর্ট, ফুটসাল হাইভ, এক্সলেড; বসুন্ধরায় জ্যাফ, বসুন্ধরা স্পোর্টস সিটি, হ্যাঙআউট, কোর্টসাইড, গ্রিনভিল; মিরপুরে অফসাইড, দ্য স্পোর্টস এরেনা, ডিবক্স; উত্তরায় জিএসপি, টার্ফ টেন্ট, দ্য মালাবো স্পোর্টস এরেনা; মোহাম্মদপুরে গো সেভেন, দ্য রয়েল মাল্টিস্পোর্টস এরেনা, রিভারশোর স্পোর্টস এরেনা; যাত্রাবাড়ীর কোনাপাড়ায় নাইন্টি মিনিটস, প্লেমেকার, ইউএইচএফসি; তেজগাঁওয়ে টার্ফ নেশন ইত্যাদি।
পাড়ার (থাকলে) বা সরকারি মাঠে খেলার সুযোগ পাওয়া যায় বিনা মূল্যে। কিন্তু টার্ফে খেলার জন্য গুনতে হবে মোটা অঙ্কের টাকা। সকাল থেকে শুরু করে মধ্যরাত অবধি সময়ের মধ্যে দেড় ঘণ্টার স্লট করে টার্ফ ভাড়া নেওয়া যায়। মাঠ ও সময়ভেদে ভাড়ার অঙ্ক ২ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত। ছোট মাঠে একেক দলে ছয়জন করে এবং বড় মাঠে আটজন করে খেলতে পারে। সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে বিকেল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত। ছুটির দিনগুলোতে (শুক্র ও শনি) টার্ফে ভিড় বেশি থাকে। অফ সিজনে বা বুকিং কম থাকলে মূল্যছাড় দেওয়া হয়। মোহাম্মদপুরের গো সেভেন টার্ফের ব্যবস্থাপক মাজহারুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ঢাকায় টার্ফের সংখ্যা বাড়ছে। টার্ফ হওয়ায় শহরের তরুণদের মধ্যে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ জন্মেছে।’
টার্ফকে কেন্দ্র করে দৈনন্দিন খেলার বাইরে বিশেষ কিছু কার্যক্রমও চলছে। গড়ে উঠছে টার্ফকেন্দ্রিক শখের খেলোয়াড়দের ক্লাব। তাদের মধ্যে টুর্নামেন্ট হয়। করপোরেট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মচারীদের নিয়ে নিয়মিত খেলার আয়োজন করে। তৈরি হয়েছে মাঠ বুকিংয়ের অ্যাপ, ফেসবুক-ভিত্তিক গ্রুপ। টার্ফের খেলোয়াড়দের কেন্দ্র করে জার্সি, টার্ফ শু এবং পানীয়র ব্যবসাও তৈরি হয়েছে।
ফুটবল একটি দলীয় খেলা। তাই নিয়মিত টিম তৈরি করে খেলা একজন একক ব্যক্তির জন্য কঠিন। ‘ইলেভেন ব্রাদার্স’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম ঢাকার বিভিন্ন টার্ফে এ রকম একক খেলোয়াড় সংগ্রহ করে টিম তৈরি করে খেলার ব্যবস্থা করে দেয়। প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠাতা রাফি ফরাজি বলেন, ‘আমি নিজে খেলতে গিয়ে খেলোয়াড়ের সংকটে পড়েছি। যেহেতু টাকা দিয়ে খেলতে হয়, প্লেয়ারের সংকট হলে সমস্যা হয়ে যায়। সেখান থেকে আমরা এই ব্যবস্থা শুরু করি। যে কেউ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঢাকার যেকোনো জায়গায় ম্যাচে অংশ নিতে পারে।’
টার্ফ মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটি টার্ফ মাঠ তৈরিতে কৃত্রিম ঘাস, ফ্লাডলাইট, বাথরুম, শাওয়ার, ড্রেসিংরুম, ছোট আকারের দর্শক গ্যালারি, নিরাপত্তাব্যবস্থা, জমির ভাড়া এবং অন্যান্য অবকাঠামো মিলিয়ে আয়তনভেদে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকার মতো খরচ হয়।
নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘বেসরকারি টার্ফের মাঠ কিছুটা চাহিদা পূরণ করলেও সেগুলো ব্যয়বহুল হওয়ায় সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি হয় না। এতে খেলাধুলায়ও বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে।’
আদিল মুহাম্মদ খানের মতে, খেলাধুলার মৌলিক পর্যায়ের সুযোগকে বাণিজ্যিক করা উচিত নয়। বরং সরকারের উচিত বিনা মূল্যে ব্যবহারযোগ্য, সবার জন্য উন্মুক্ত খেলার মাঠের সংখ্যা বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া।