লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায় শেষ। বাংলাদেশ সময় আজ সকালে মনুমেন্তালে বেনিনের বিপক্ষে খেলে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বললেন মেসি। দীর্ঘ ২১ বছরের আর্জেন্টিনার ভক্ত-সমর্থকদের মনে রাখার মতো অসংখ্য মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন তিনি। তবে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ী ফুটবলারের একটা ঘটনা এখনো তাঁর হৃদয়ে দাগ কেটেছে।
এমনিতেই আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ ম্যাচ। তার ওপর মনুমেন্তালে ম্যাচ বলেই মেসি অনেক আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর ২০২৩ সালের মার্চে মনুমেন্তালে পানামার বিপক্ষে ম্যাচে মেসি ও তাঁর সতীর্থরা বিশ্বকাপ নিয়ে উদযাপন করেছিলেন। আজ বেনিনকে ৩-০ গোলে হারানোর পর বিদায়ী ভাষণে মেসি বলেন, ‘আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আনন্দের দিনগুলোর একটি আমি এখানে অনুভব করেছি। বিশ্বকাপ জয়ের পর যখন আমরা আবার খেলার মাঠে ফিরেছিলাম। সেদিনের অভিজ্ঞতা আমি কখনো ভুলব না।’
২০১৪ সালে জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হেরে বিশ্বকাপ জেতা হয়নি মেসির। আট বছর পর কাতারে ধ্রুপদী ফাইনাল জিতে তিনি পূরণ করেন তাঁর আজন্মলালিত স্বপ্ন। পরম আরাধ্য বিশ্বকাপ ট্রফি নিয়ে ২০২৩ সালে ঘরের মাঠে উদযাপনের সেই ভিডিও দেখে এখনো স্মৃতিচারণ করেন আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ী ফুটবলার। সাড়ে তিন বছর পর মনুমেন্তালে বিদায়ী ভাষণের সময় মেসি বলেন, ‘দিনটি (২০২৩ সালের মার্চ) ছিল অসাধারণ সুন্দর। আজও আমি সেই দিনের ভিডিও দেখি আর আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। সেই দিনটি চিরকাল আমার ইতিহাসে এবং আমার পরিবারের ইতিহাসে লেখা থাকবে। দিনটি ছিল অসাধারণ।’
মনুমেন্তালে আজ আর্জেন্টিনা-বেনিন ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজতেই মেসি নামের মহীরূহর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার। স্টেডিয়ামের আকাশে লেজার শোতে দেখানো হয় আর্জেন্টিনার তারকা ফুটবলারকে। আর্জেন্টিনার জার্সিতে আজ তাঁর বিদায়ী ম্যাচের দিন মনুমেন্তাল কানায় কানায় পূর্ণ থাকে। মাইক্রোফোন হাতে বিদায়ী ভাষণের শুরু করতে না করতেই মেসির উদ্দেশ্যে করতালিতে ফেটে পড়ল পুরো স্টেডিয়াম।
শুধু আজই নয়। বিশ্বের যে স্টেডিয়ামেই মেসি খেলেছেন, সেখানে তাঁর জার্সি পরে গ্যালারিতে ভক্ত-সমর্থকেরা খেলা দেখেছেন। ৩৯ বছর বয়সী আর্জেন্টিনার সদ্য সাবেক ফুটবলার বেনিনকে ৩-০ গোলে হারানোর পর বলেন, ‘এত বছর ধরে, আমি যেখানেই গিয়েছি, স্টেডিয়াম সবসময় পরিপূর্ণ ছিল—ম্যাচ বিশ্বকাপের হোক বা কোপা আমেরিকার। তাঁরা সব জায়গায় ছিলেন। আমাদের জন্য এত বড় ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।’
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকো, ব্রাজিল, কাতারসহ বিশ্বের অনেক দেশেই খেলার সুযোগ হয়েছে মেসির। যেখানেই গিয়েছেন, ভক্ত-সমর্থকদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছে পুরো আর্জেন্টিনা দল। তা সম্ভব হয়েছে মেসির কারণেই। বিশ্বের যেকোনো স্টেডিয়ামই ভক্ত-সমর্থকদের কারণে আপন মনে হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। বিদায়ী ভাষণে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ী ফুটবলার বলেন, ‘আমরা জানি, এটা কতটা কঠিন। সব সময় অনুভব করেছি, যেখানেই খেলি না কেন, আমরা যেন ঘরের মাঠেই খেলছি। সত্যিই সেটা আমরা অনুভব করেছি।’
পরবর্তীতে ২০১৫, ২০১৬ সালে টানা দুইবার কোপা আমেরিকায় হয়েছেন রানার্সআপ। এমনকি ২০১৬ সালে নিয়েছিলেন অবসরও। কিন্তু অবসর ভেঙে ফিরে যা করলেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ২০২২ ফুটবল বিশ্বকাপ জিতে মেসি তাঁর আজন্মলালিত স্বপ্নপূরণ করেছেন। জিতেছেন ২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ ফিনালিসিমা, ২০২৪ কোপা আমেরিকাও।
বেনিনকে হারিয়ে বিদায়ী ম্যাচ শেষে মেসি বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমি আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি কথা বলছি। আমি যেতে চাই না। আমি মাঠ ছেড়ে যেতে চাই না। আপনাদের সবাইকে ভালোবাসি। ভীষণ মিস করব আপনাদের। আর্জেন্টাইন হতে পেরে গর্বিত।’
বিদায়ী ম্যাচে দলের তিনটি গোলেই অবদান রেখেছেন মেসি। নিকো পাস, নিকোলাস ওতামেন্দিকে দিয়ে গোল করিয়েছেন। ৭১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে করেন গোল। তাঁর বিদায়ী ভাষণ লিওনেল স্কালোনিসহ মনুমেন্তালের দর্শকেরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছেন। এনসো ফের্নান্দেসসহ কয়েক জন ফুটবলারের চোখে দেখা গেছে অশ্রু। আতশবাজি আর মেসিকে ঘিরে নাচানাচিতে হয়ে গেল তাঁর বিদায়। মেসির মতো ওতামেন্দিও আজ আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ ম্যাচ খেলে ফেলেছেন।