জাতীয় ফুটবল দল নিয়ে এখন যতটা না মাঠের পরিকল্পনা, তার চেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে দলের চারপাশের পদ-পদবি নিয়ে। ফিফা আসিয়ান কাপ সামনে রেখে গত বৃহস্পতিবার ক্যাম্প শুরু হয়েছে ঢাকায়। অনুশীলনও চলছে দুবেলা করে। এর মধ্যেই বদলেছে দলের ম্যানেজার। সঙ্গে তৈরি হয়েছে কো-অর্ডিনেটর ও টিম লিডারের পদ। ক্যাম্পের মাঝপথে এমন রদবদলে প্রশ্ন উঠেছে, জাতীয় দলের প্রয়োজনেই কি এসব সিদ্ধান্ত, নাকি কর্মকর্তাদের জায়গা দেওয়ার হিসাবও আছে এর পেছনে?
দেড় বছরের বেশি সময় জাতীয় দলের ম্যানেজারের দায়িত্ব সামলেছেন আমের খান। হঠাৎ তাঁকে সরিয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাফুফের নির্বাহী কমিটির সদস্য আমিরুল ইসলাম বাবুকে। কয়েক দিন ধরে ম্যানেজার পদটি নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছিলেন অনেকে। শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব পেয়েছেন মোহামেডানের এই কর্মকর্তা।
বাবুর জাতীয় দলের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা অবশ্য পুরোনো। কাজী সালাউদ্দিনের সময় প্রায় এক দশক নারী জাতীয় দলের সিনিয়র ও জুনিয়র দলের ম্যানেজার ছিলেন তিনি। পুরুষ জাতীয় দলেও একাধিকবার একই দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই অভিজ্ঞতার ওপর ভর করেই তাঁকে বেছে নেওয়া হয়েছে কি না, সেই ব্যাখ্যা দেয়নি বাফুফে। কিন্তু বর্তমান জাতীয় দলের বাস্তবতা আগের মতো নেই।
হামজা চৌধুরী, শমিত সোমদের মতো খেলোয়াড়েরা এখন জাতীয় দলের অংশ। বিদেশে থাকা ফুটবলারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, ক্লাবের সঙ্গে সমন্বয়, ভ্রমণ এবং নানা প্রশাসনিক বিষয় সামলে দল চালাতে হয়। আধুনিক ফুটবলের এই বাড়তি চাহিদার সঙ্গে বাবুর অভিজ্ঞতা কতটা মানানসই, সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ফুটবল মহলে।
আমের খানের সরানোর প্রক্রিয়াতেও স্বাভাবিকতার ছাপ নেই। ম্যানেজারের দায়িত্বে আর নেই—এই খবর তাঁকে সরাসরি জানানোর বদলে পৌঁছেছে মিডিয়া ম্যানেজারের মাধ্যমে। এরপর দেওয়া হয়েছে ‘কো-অর্ডিনেটর’ পদ। জাতীয় দলে আগে নিয়মিত দেখা যায়নি এমন পদে তাঁকে কী দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সেটিও চিঠিতে স্পষ্ট ছিল না।
আমের খান বলেন, ‘মিডিয়া ম্যানেজারের মাধ্যমে জানতে পেরেছি, ম্যানেজার পদে আমি আর নেই। কো-অর্ডিনেটরের কাজটা কী, সেটা বোধগম্য নয়। এটা প্রমোশন নাকি ডিমোশন, কে বলবে!’
জাতীয় দল, বাফুফে ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়, বিদেশি ও প্রবাসী খেলোয়াড়দের ভ্রমণ ও ভিসা, নতুন খেলোয়াড় খোঁজা, প্রস্তুতি ম্যাচ আয়োজন, নিরাপত্তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রাখাটা কো-অর্ডিনেটরের কাজ বলে এমন এক ব্যাখ্যা মিলেছে বাফুফের কাছ থেকে।
ম্যানেজারের দায়িত্বের তালিকাও কম নয়। দলের সভায় থাকা, টুর্নামেন্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ, জার্সি ও সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা, খেলোয়াড়দের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, চোটের চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং ক্লাবগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে তাঁকে। দলের গণমাধ্যম নীতিও তাঁর তত্ত্বাবধানে থাকবে।
দুটি পদের দায়িত্ব যখন এতটাই বিস্তৃত, তখন প্রশ্ন আরও বড় হয়ে ওঠে—এত দিন জাতীয় দলের কাজগুলো কীভাবে চলছিল? নতুন করে দায়িত্ব ভাগ করার প্রয়োজনটি কেন এখনই দেখা দিল? ক্যাম্পের মাঝপথেই-বা কেন এই পরিবর্তন? অপ্রয়োজনীয় বাড়তি পদ তৈরি করে কর্তাদের ভ্রমণবিলাসের প্রশ্নটিও আসছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ‘টিম লিডারে’র আরেকটি পদ। বাফুফের আরেক নির্বাহী সদস্য এবং সাবেক জাতীয় ফুটবলার ইকবাল হোসেনকে দেওয়া হয়েছে এই দায়িত্ব। জাতীয় দলের ম্যানেজমেন্টে একসঙ্গে এত নতুন পদ এবং দায়িত্ব বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাই প্রশ্ন থাকছেই। সম্প্রতি অনূর্ধ্ব-২০ দলের উজবেকিস্তান যাত্রায় দেখা গেছে কর্মকর্তাদের আধিক্য। এমনকি রাখা হয়েছে ম্যানেজারের সহকারীও।
ক্লাব কর্মকর্তাদের জাতীয় দলের ক্যাম্পে আনার সংস্কৃতি বাফুফের বেশ পুরোনো। ঢাকা আবাহনীর সত্যজিৎ দাশ রুপু ম্যানেজার থাকার সময় বসুন্ধরা কিংস আপত্তি জানিয়েছিল। বাবু বাফুফের পাশাপাশি মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবেরও টিম লিডারের দায়িত্বে আছেন।
সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় ফিফা আসিয়ান কাপের আগে দলের দরকার ছিল পরিকল্পনা, প্রস্তুতি আর স্থিতিশীলতা। সেই জায়গায় জাতীয় দলের চারপাশে এখন বাড়ছে পদ আর পদবির খেলা। এসব দলের কতটা কাজে আসছে, তা নিয়েই বাড়ছে প্রশ্ন।