ম্যাচ তখনো শেষ হয়নি, তবে ফ্রান্সের জয় নিয়ে দুর্ভাবনাও কেউ করেননি। টাচলাইনে দাঁড়িয়ে দিদিয়ের দেশম মাথা নিচু করে কিলিয়ান এমবাপ্পেকে কুর্নিশ জানালেন। দৃশ্যটি শুধু জোড়া গোল করা অধিনায়কের প্রতি অভিনন্দন নয়, বরং এমন এক ফুটবলারের প্রতি নীরব স্বীকৃতি, যিনি প্রচলিত কোচিংয়ের বহু নিয়মকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছেন।
সুইডেনকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে ফ্রান্স। স্কোরশিটে এমবাপ্পের নামের পাশে দুটি দৃষ্টিনন্দন গোল, আরেকটি ব্র্যাডলি বারকোলার।
বিশ্বকাপে নকআউট পর্বে নিজের মোট গোলসংখ্যা ১০-এ নিয়ে গেছেন এমবাপ্পে, যা এই প্রতিযোগিতার ইতিহাসে যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি। চলমান আসরে এটি তাঁর ষষ্ঠ গোল, যা গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে তাঁকে লিওনেল মেসির সমানে নিয়ে এসেছে। তিন বিশ্বকাপে মাত্র ১৮ ম্যাচে ১৮ গোল করে তিনি মেসির ১৯ গোলের সর্বকালের রেকর্ডের একেবারে হাতছোঁয়া দূরত্বে পৌঁছে গেছেন।
সুইডেনের কোচ গ্রাহাম পটার ম্যাচ শেষে প্রতিপক্ষের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি এর চেয়ে সেরা কোনো দল আর দেখিনি। এই ম্যাচে ফল পেতে হলে আমাদের সব দিক থেকে নিখুঁত খেলতে হতো, কিন্তু আমরা আমাদের সেরাটা দিয়ে নিখুঁত হলেও তাদের দমাতে পারতাম কি না, তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।’
অথচ মাত্র এক মাস আগেও রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে টানা দুটি ট্রফিহীন মৌসুম কাটানোর পর এমবাপ্পেকে নিয়ে সমালোচনা ও বিতর্কের অন্ত ছিল না। ইনজুরি, ক্লাবের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর দর্শকদের দুয়োধ্বনি তাঁর ওপর যে মানসিক চাপ তৈরি করেছিল, ফরাসি শিবিরের চনমনে পরিবেশে তার কোনো ছাপই নেই।
রিয়াল মাদ্রিদের সেই অস্থিরতা এবং অঁরেলিয়েঁ চুয়ামেনি ও ফেদেরিকো ভালভার্দের ড্রেসিংরুমের মারামারির মতো নেতিবাচক পরিবেশ থেকে দূরে এসে দিদিয়ের দেশমের ছায়ায় এমবাপ্পে এখন সম্পূর্ণ মুক্ত এবং শারীরিকভাবে পুরোপুরি ফিট।
ফ্রান্স দলের এই অদম্য রূপের পেছনে কেবল এমবাপ্পের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যই নয়, বরং উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে এবং ব্র্যাডলি বারকোলার সঙ্গে তাঁর দুর্দান্ত বোঝাপড়াও বড় ভূমিকা রাখছে। মাঠের এই রসায়নের পাশাপাশি দলের মানসিক বন্ধনও এবার সবার চোখে পড়ার মতো ছিল।
সদ্য মাতৃহারা কোচ দিদিয়ের দেশমকে গোল করার পর এমবাপ্পের দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরার দৃশ্যটি ছিল টুর্নামেন্টের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত। ম্যাচ শেষে এমবাপ্পে বলেন, ‘আমার মনে হয়, এই উদ্যাপন আমাদের দলের মূল স্পিরিটকে প্রতিফলিত করে, এটি আমাদের ডিএনএর অংশ। আমরা সবাই এখানে একসঙ্গে আছি। কোচ ভালো করেই জানেন, আমাদের মধ্যে তিনি কখনো একা নন, আমরা সব সময় তাঁকে সর্বোচ্চ সমর্থন দিয়ে যাব।’
চার ম্যাচে ১৩ গোল করা ফ্রান্সকে অনেকেই এখন শিরোপার প্রধান দাবিদার ভাবছেন, তবে ফুটবলের নিষ্ঠুর ও অনিশ্চিত প্রকৃতি যেকোনো মুহূর্তেই পাশার দান উল্টে দিতে পারে। বাস্কেটবলের মতো এই খেলায় কেবল আধিপত্য বিস্তার করলেই বড় ব্যবধানের জয় নিশ্চিত হয় না, বরং একটি ভুল সিদ্ধান্ত বা ভাগ্যের ফেরে জার্মানির মতো পরাশক্তিকেও প্যারাগুয়ের কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিতে হয়।
আগামী শনিবার ফিলাডেলফিয়ায় শেষ ষোলোর ম্যাচে ফ্রান্সের মুখোমুখি হবে সেই রক্ষণাত্মক প্যারাগুয়েই। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে খেলোয়াড় ও অধিনায়ক হিসেবে দেশম নিজে প্যারাগুয়ের রক্ষণ ভাঙতে কতটা ভুগেছিলেন এবং ১১৪ মিনিটের গোল্ডেন গোলে জিতেছিলেন, তা হয়তো বর্তমান দলের চেয়ে ভালো কেউ জানে না।
প্যারাগুয়ের চেনা নিরেট রক্ষণাত্মক কৌশলের সামনে এমবাপ্পের গতি ও ফ্রান্সের আক্রমণভাগ কতটা কার্যকর হয় এবং তারা এই অনিশ্চয়তার খেলাকে জয় করতে পারে কি না, তার ওপরই এখন পুরোপুরি নির্ভর করছে ফরাসিদের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন।