মেটলাইফ স্টেডিয়ামে কাল ৮০ হাজার ৬৬৩ জন দর্শকের ৭০ শতাংশই ছিল ব্রাজিলিয়ান। হলুদের মাঝে ফুটে উঠল ছোপ ছোপ রক্তরাঙা মরক্কোর লাল জার্সি। ব্রাজিল অনেকটা ঘরের পরিবেশে খেলেও বিশ্বকাপে নিজেদের শুরুটা করেছে পয়েন্ট খুইয়ে।
বেলা ১টায় নিউইয়র্কের পেন স্টেশনে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ট্রেন ধরতে গিয়েই দেখা গেল হলুদের সারি। দর্শকের সঙ্গে প্রায় ৩০ মিনিটের যাত্রায় কত রকম ভবিষ্যদ্বাণী শোনা গেল। সেগুলো একবাক্যে সারাংশ করলে দাঁড়ায়: ব্রাজিলের জয়। কিন্তু মাঠে খেলা শুরু হতেই ভিন্ন ছবি। ‘আফ্রিকান ব্রাজিল’ মরক্কোর আক্রমণাত্মক ফুটবলের সামনে নিজেদের চেনা ছন্দ হারিয়ে ধুঁকতে হলো আসল ব্রাজিলকে।
খেলার শুরু থেকে গতিময় ও আক্রমণাত্মক ফুটবলে ব্রাজিলকে পুরোপুরি কোণঠাসা করে ফেলে হাকিমিদের মরক্কো। প্রথম ১৫ মিনিট ব্রাজিলের রক্ষণভাগে এতবার ঢুকে পড়েছেন হাকিমি-দিয়াজরা, ব্রাজিল যে আরও গোল খায়নি, তাদের সৌভাগ্য। ডাগআউটে বসা নেইমারকে খেলা শুরুর আগেই খুঁজে নিয়েছে শতাধিক আলোকচিত্রীর ক্যামেরা। ডাগআউটে বসে মরক্কোর আক্রমণ দেখে কি পা দুটো নিশপিশ করছিল চোটে পড়া নেইমারের?
ম্যাচের ২১ মিনিটে মরক্কোর আক্রমণের কাছে হারই মানল ব্রাজিলের দুর্বল মধ্যমাঠ আর রক্ষণ। মাঝমাঠে লুকাস পাকেতা বল হারালে রিয়াল তারকা ব্রাহিম দিয়াজের রক্ষণচেরা পাস ধরে ইসমায়েল সাইবারি নিখুঁত চিপ শটে আলিসন বেকারকে পরাস্ত করেন। পিছিয়ে পড়ায় মেটলাইফের গ্যালারিতে স্তব্ধতা। মাঠে আসা কিংবদন্তি কাফু-কার্লোসরাও কি কিছুটা হতাশ?
ব্রাজিলের এই দলটার প্রাণভোমরা আসলে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। তিনি লেফট ফ্লাঙ্কে যতটা সক্রিয় কিংবা চেষ্টা করা যায়, সবই করছিলেন রিয়াল তারকা। ৩২ মিনিটে ব্রাজিলকে আনন্দে ভাসান ভিনি। ব্রুনো গিমারেসের পাস পেয়ে মরক্কোর রক্ষণভাগকে হারিয়ে ক্ষিপ্র গতিতে ডি-বক্সে ঢুকে দর্শনীয় শটে গোল দিয়েই শূন্যে লাফিয়ে ভিনির উদ্যাপন। ডাগআউটে গুরু কার্লো আনচেলত্তির মুখে কিছুটা স্বস্তি।
রক্ষণ ও মাঝমাঠকে শক্তিশালী করতে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে কাসেমিরো ও ইবানেসকে তুলে ফাবিনিও ও দানিলোকে নামান আনচেলত্তি। এতে গতি বাড়ে ব্রাজিলের খেলায়। ৫১ মিনিটে ইগর থিয়াগোর শট মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু আটকে দিলে লিড নেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হয় ব্রাজিলের।
৭৭ মিনিটে আবারও ব্রাজিলের সুযোগ। সহজ সুযোগটা নষ্ট করেন রাফিনিয়া। মাথিয়াস কুনিয়ার চমৎকার পাস থেকে বক্সে বল পেয়ে ভিনিসিয়ুস নিজে শট না নিয়ে ডান প্রান্তে ফাঁকায় থাকা রাফিনিয়াকে বল বাড়িয়ে দেন। অবাক করে রাফিনিয়া নিলেন দুর্বল শট। শেষ পর্যন্ত আর কোনো গোল না হওয়ায় ১-১ সমতায় শেষ ব্রাজিল-মরক্কোর ম্যাচ।
মরক্কো যথেষ্ট শক্তিশালী, র্যাঙ্কিংয়েও খুব বেশি পার্থক্য নেই। ব্রাজিল ছয়ে, মরক্কো সাতে। হাকিমির নেতৃত্বে মরক্কোর রক্ষণ বিশ্বের অন্যতম সেরা। এমন দলের বিপক্ষে ব্রাজিলের মধ্যমাঠ যদি নিষ্প্রাণ থাকে, ফরোয়ার্ডেরা সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়, আনচেলত্তির মতো ফুটবল পৃথিবীর বড় মাস্টারমাইন্ডের পক্ষেও জেতা সম্ভব নয়। ব্রাজিল সে কারণে ১ পয়েন্ট নিয়েই সন্তুষ্ট থাকল। তবে হৃদয় জিতেছে মরক্কো। জমাট রক্ষণ, স্বভাবসুলভ গতি আর আক্রমণের ঝড় তুলে তারা ব্রাজিলের ওপরে থেকে গ্রুপপর্ব শেষ করার বার্তা দিয়েছে।
মজার ব্যাপার, মেটলাইফে ম্যাচ শেষে যত ব্রাজিলিয়ানের সঙ্গে কথা হলো, তাঁরা অখুশি নন ব্রাজিলের পারফরম্যান্সে। তাঁদের কথা, বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচ, সেটাও আবার মরক্কোর মতো দলের বিপক্ষে। ড্র হলেও ঠিক আছে। হাইতি-স্কটল্যান্ডকে উড়িয়ে দিয়ে নিশ্চিত ছন্দে ফিরবে সেলেসাওরা।