পৃথিবীর এক মাথা থেকে আরেক মাথায় সাইকেল চালিয়ে যাওয়া মানুষ আছেন। কিন্তু লাতিন আমেরিকা থেকে উত্তর আমেরিকার বুক চিরে শুধু একটা ফুটবল দলকে সমর্থন জানাতে ছুটে যাওয়া—এ কাহিনি অন্য রকম।
সাড়ে নয় মাসে সাইকেলে পাড়ি দিয়েছেন ১৭ হাজার কিলোমিটার পথ। পার হয়েছেন ১৭টি দেশের সীমানা। লক্ষ্য একটাই—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রিয় দল আর্জেন্টিনাকে গ্যালারিতে বসে সমর্থন জোগানো।
মিগুয়েল সিলিও (৫৬), ইয়ামান্দু মার্তিনেস (৪৯) এবং ভিসেন্তে কোনকুলিনি (২৯)—আর্জেন্টাইন এই তিন সাইক্লিস্টের গল্পটা যেকোনো রোমাঞ্চকর উপন্যাসকেও হার মানায়। আর্জেন্টিনার এন্ত্রে রিওস প্রদেশের গুয়ালেগুয়া শহর থেকে শুরু হয়েছিল তাঁদের এই স্বপ্নযাত্রা। গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটিতে আলবিসেলেস্তেদের ক্যাম্পের সামনে যখন তাঁরা এসে পৌঁছান, তখন সেখানে এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। উপস্থিত সবাই তাঁদের এমনভাবে বরণ করে নেন, যেন তাঁরা কোনো রকস্টার! বিশ্বখ্যাত ‘ট্যুর ডি ফ্রান্স’ জয়ের মতো করেই একে অপরের গায়ে শ্যাম্পেন ঢেলে মেতে ওঠেন উদযাপনে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে তাঁরা পুরো যাত্রার খুঁটিনাটি নিয়মিত তুলে ধরেছেন। তবে এই অবিশ্বাস্য যাত্রা তাঁদের জন্য মোটেও প্রথম নয়। দলনেতা মিগুয়েলের জন্য এটি হ্যাটট্রিক। এর আগে ২০১৮ সালের রাশিয়া এবং ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও তিনি দুই চাকার ওপর ভর করেই পৌঁছেছিলেন। মূলত কাতার বিশ্বকাপের পরই, অর্থাৎ সাড়ে তিন বছর আগে থেকেই শুরু হয় ২০২৬ সালের এই মিশন। লিওনেল স্কালোনির দল কোথায় খেলবে, তা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই গত বছরের ১৬ আগস্ট সাইকেল নিয়ে ঘর ছাড়েন তাঁরা।
পাগলাটে ও রোমাঞ্চকর ধারণার মূল হোতা মিগুয়েল সিলিও আর্জেন্টিনার শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ক্লারিনকে তাঁদের পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা ১৬ আগস্ট রওনা হয়েছিলাম এবং আমাদের হাতে পর্যাপ্ত সময় ছিল, যাতে প্রয়োজন হলে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারেও পৌঁছাতে পারি। যখন জানা গেল যে কানসাস আর্জেন্টিনার ভেন্যু হতে যাচ্ছে, তখন অতিরিক্ত সময়টুকু আমরা যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের শেষ মাসটি বেশ নিশ্চিন্তে এবং কোনো তাড়াহুড়ো ছাড়াই উপভোগ করার জন্য ব্যবহার করেছি। অবশেষে আমরা পৌঁছে গেছি এবং আমরা অত্যন্ত খুশি।’
যাত্রাপথে দুবার সাইকেল থেকে পড়ে গিয়েও দমে যাননি ৪৯ বছর বয়সী ইয়ামান্দু মার্টিনেজ। নিজের সাইকেলটি শক্ত করে ধরে রেখে তিনি বলেন, ‘২০২২ সাল থেকেই আমরা এই ভ্রমণটার পরিকল্পনা করছিলাম, যাতে আজকের এই দিনটিতে এখানে এসে পৌঁছাতে পারি।’
আর্জেন্টাইন কোচ স্কালোনির মতোই সাইকেল চালানোর প্রতি এক অদ্ভুত টান রয়েছে এই তিনজনের। তবে এই দীর্ঘ পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। পদে পদে ছিল জীবনহানির ঝুঁকি। ইকুয়েডরে পৌঁছানোর পর সেখানে একটি কারাগারে ভয়াবহ দাঙ্গা বেঁধে যায়, যার ফলে বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। পরিস্থিতি বিবেচনায় সেখানে যাত্রা থামিয়ে বাধ্য হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে হয়েছিল তাঁদের। আবার কলম্বিয়ায় ভ্রমণের সময় ঠিক তাঁদের রুটেই একটি গাড়ি বোমা বিস্ফোরিত হয়। স্থানীয় প্রশাসনের কড়া নির্দেশে সে সময় একটি হোটেলে অবরুদ্ধ থাকতে হয়েছিল এই তিন সাইক্লিস্টকে। তবে সব বাধা পেরিয়ে তাঁরা এগিয়ে গেছেন লক্ষ্যের দিকে।
ঝুঁকিপূর্ণ এই যাত্রায় যেমন ছিল আতঙ্ক, তেমনি জমা হয়েছে দারুণ সব স্মৃতি। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে পৌঁছানোর পর বাস্কেটবল দুনিয়ার আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি মানু জিনোবিলির সঙ্গে দেখা হওয়াটা তাঁদের জীবনের অন্যতম সেরা প্রাপ্তি। তরুণ ভিসেন্তে কোনকুলিনি সেই মুহূর্তটি হাতড়ে বলছিলেন, ‘দুই বা তিন সপ্তাহ আগে আমরা মানু জিনোবিলির দেখা পাই, একটা বাস্কেটবল কোর্টে ওঁর সঙ্গে আমাদের দেখা হয়। আমরা এর আগে ওনাকে টেক্সট পাঠিয়েছিলাম এবং উনি সাড়াও দিয়েছিলেন। আমরা তাঁর এবং তাঁর মায়ের সঙ্গে প্রায় দুই-তিন ঘণ্টা বসে কফি খেয়েছি। আমাদের এই সাইকেল যাত্রা এবং বাস্কেটবল থেকে অবসরের পর ওঁর জীবন কেমন কাটছে—এসব নিয়ে খুব সুন্দর একটা আড্ডা হয়েছিল।’
কানসাসে আর্জেন্টিনা দলের হোটেলের সামনে এখন এই তিন বীর। ইয়ামান্দু জানালেন, দলের অন্তত ৮০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে যে অফিশিয়ালদের কেউ একজন এসে তাঁদের ক্যাম্পের ভেতরে স্বাগত জানাবেন। অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে নিয়ে রসিকতা করতেও ছাড়লেন না তিনি,‘আমরা জানি যে মেসি ইতিমধ্যেই (আর্জেন্টাইন ঐতিহ্যবাহী চা) “মাতে” খাওয়ার জন্য জল গরম করছেন।’
পাশে থাকা মিগুয়েল তখন হেসে ইয়ামান্দুর কথার রেশ ধরে মেসিকে এক মৃদু চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, ‘ক্ষমা করবেন, তবে আমরা ওনাকে মাতে তৈরি করা শেখাব। কারণ উনি মাঠের সেরা খেলোয়াড় হতে পারেন, কিন্তু মাতে বানানোর ক্ষেত্রে আমাদের এন্ত্রে রিওসের বাসিন্দাদের কাছ থেকে তাঁর একটা ক্লাস নেওয়া উচিত।’
৫৬ বছর বয়সী মিগুয়েল শোনালেন তাঁর গত ২৫ বছরের সাইকেল ভ্রমণের মূল দর্শন। কেন এই বয়সেও এমন কঠিন চ্যালেঞ্জ নেন? মিগুয়েলের উত্তর ‘আমি এটা নিয়মিতই ভাবি, কারণ গত ২৫ বছর ধরে আমি সাইকেলে ভ্রমণ করছি। আমি এটা করি জীবনের নশ্বরতা বা শেষ হয়ে যাওয়ার চেতনা থেকে। আমি জানি যে আমাদের সময় খুব সীমিত, বয়সের সাথে সাথে স্বাস্থ্যও একসময় চলে যাবে। তাই যতক্ষণ পারছি, জীবনটাকে উপভোগ করার চেষ্টা করছি। ৫৬ বছর বয়সে এসেও আমি যে আমার ভালোবাসার কাজটি এভাবে করে যেতে পারছি, তা আমাকে পরম আনন্দ দেয়।’
বিশ্বকাপের মাঠে আর্জেন্টিনা ট্রফি জিতবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে মেসির দলকে ভালোবেসে সাড়ে ৯ মাসে ১৭ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া এই তিন আর্জেন্টাইন যে ইতিমধ্যেই জীবনের এক পরম ট্রফি জিতে নিয়েছেন, তা বলাই বাহুল্য।