অস্ট্রেলিয়ার মাঠে এক টেস্ট জিতেই বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস এখন তুঙ্গে। ইয়ান বিশপ-আকাশ চোপড়া, হার্শা ভোগলের মতো ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন, ডারউইন টেস্ট জিতে ক্রিকেট বিশ্বকে নাজমুল হোসেন শান্ত-মেহেদী হাসান মিরাজ-মুমিনুল হকরা বিশেষ বার্তা দিয়েছেন। হাসান মাহমুদও যেন বিশপদের সুরে সুর মিলিয়েছেন।
ডারউইনে ৯ উইকেটের জয়ের আগে অস্ট্রেলিয়ার মাঠে বাংলাদেশ টেস্ট খেলেছে ২০০৩ সালে। ২৩ বছর আগে সেই টেস্টের দুটিতেই ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ। কোনোটিই পাঁচ দিনে গড়ায়নি। শান্তর নেতৃত্বে এবার বাংলাদেশ সাড়ে তিন দিনেই পেয়েছে ৯ উইকেটের আয়েশি জয়। প্রথম টেস্টের ম্যাচসেরা হাসান গত রাতে স্টার স্পোর্টসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট বিশ্বে সমীহ জাগানিয়া দলে পরিণত হয়েছে। ২৬ বছর বয়সী বাংলাদেশের পেসার বলেন, ‘সবাই এখন বুঝতে পেরেছে যে বাংলাদেশ আর আগের মতো নাই। দিন দিন অনেক উন্নতি করছে। বিশ্বের যেকোনো দলকে হারাতে সক্ষম বাংলাদেশ।’
দেশের চেয়ে বাইরেই হাসান বেশি সফল। ৪৫ টেস্ট উইকেটের ৩৩টিই তিনি নিয়েছেন বিদেশের মাঠে। গতির চেয়েও সুইং, নিখুঁত লাইন-লেংথে ব্যাটারদের কাবু করতে ওস্তাদ এই পেসার। ব্রেট লি, শোয়েব আখতারদের মতো কিংবদন্তিদের দেখেই পেসার হওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন হাসান। স্টার স্পোর্টসকে ২৬ বছর বয়সী বাংলাদেশের এই পেসার বলেন, ‘ছোটবেলায় ক্রিকেট শুরুর পর থেকেই অনেক কিংবদন্তি পেস বোলার দেখে আসছি। ব্রেট লি, শোয়েব আখতার, শন টেইট—আরও অনেকেই আছেন।’
২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার মাঠে যখন বাংলাদেশ টেস্ট খেলে, হাসানের বয়স তখন সাড়ে তিন বছর। ডারউইনের এই ভেন্যুটা তাঁর কাছে ‘অচেনা’ বললেও কম বলা হয়। এবার সেই ভেন্যুতে কাঁপিয়ে দিয়েছেন হাসান। তিন দিনের প্রস্তুতি ম্যাচে ৪ উইকেট নিয়েছেন। সেই ফর্মটা টেনে নিয়ে এলেন মূল ম্যাচেই। ৯ উইকেট নিয়ে হয়েছেন ম্যাচসেরা। অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের রূপকথার জয়ে সফলতার রহস্য জানাতে গিয়ে হাসান বলেন, ‘ঠিক যেভাবে নিজের পরিকল্পনা কাজে লাগিয়ে বোলিং করতে চেয়েছিলাম, সেভাবেই করতে পেরেছি। দলের অ্যানালিস্টের সঙ্গেও এটা নিয়ে কথা হচ্ছিল। তাঁর পরামর্শ ছিল, ধারাবাহিকভাবে একই জায়গায় ঠিকঠাক বোলিং করতে পারলে উইকেট আসবেই।’
ডারউইনে ৯ উইকেট নেওয়ার পথে হাসান প্রথম ইনিংসে ৫৫ রানে নিয়েছেন ৬ উইকেট। যেটা টেস্টে তাঁর এক ইনিংসে সেরা বোলিং। তিনটি ফাইফারের তিনটিই নিয়েছেন বিদেশে। ঘরের দেশে বিদেশেই বরং হাসান বেশি সফল। ৪৫ টেস্ট উইকেটের ৩৩টিই ২৬ বছর বয়সী বাংলাদেশের পেসার পেয়েছেন দেশের বাইরে। এ ছাড়া গত জুনে কেন্টের হয়ে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপ ডিভিশন টুতে নিয়েছেন ১১ উইকেট।
প্রস্তুতি ম্যাচ, মূল ম্যাচ সামনে রেখে ডারউইনের নেটে অনেক পরিশ্রম করেছেন হাসান। সতীর্থ-কোচদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। কন্ডিশর বুঝতে কিছু ম্যাচও দেখেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। স্টার স্পোর্টসকে ২৬ বছর বয়সী পেসার বলেন, ‘ডারউইনে আসার প্রথম দিন থেকেই সবাই কঠোর পরিশ্রম করেছি। নিজেদের পুরোটা নিংড়ে দিয়েছি। অনুশীলনের প্রতি মুহূর্ত ও প্রতিটি সেশনে আমাদের লক্ষ্য ছিল পরিষ্কার। অস্ট্রেলিয়ার উইকেট, তাদের সুইং ও বাউন্স বুঝতে বেশ কিছু ম্যাচ দেখে প্রস্তুতি নিয়েছি। এরপর সতীর্থ, অধিনায়ক ও কোচদের সঙ্গে বসে ম্যাচের পরিকল্পনা সাজিয়েছি।’
ছন্দে থাকা হাসান ডারউইনে সিরিজের প্রথম টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে রীতিমতো কাঁপিয়ে দিয়েছেন। ১১১ রানে ৯ উইকেট নিয়ে টেস্টে এক ম্যাচে সেরা বোলিং করেছেন তিনি। ৯ উইকেটের চারটিই করেছেন বোল্ড। তাঁর অপর ৫ উইকেটের চারটিতেই ক্যাচ ধরেন উইকেটরক্ষক লিটন দাস। একটিতে শর্ট মিড উইকেটে ক্যাচ ধরেন তানজিদ হাসান তামিম। ট্রাভিস হেড, জেক ওয়েদারাল্ড—দুই ওপেনারকে দুই ইনিংসেই ফিরিয়েছেন। বিশেষ করে দ্বিতীয় ইনিংসে ১০৪ রান করা গ্রিনকে যেভাবে শর্ট লেংথে বোলিং করে বোল্ড করেছেন, তাতে অস্ট্রেলিয়ার এই অলরাউন্ডার হতভম্ব হয়ে যান।
অস্ট্রেলিয়ার মাঠে প্রথমবার টেস্ট খেলতে নেমেই জয় পাওয়া হাসানের কাছে স্বপ্নের মতো। স্টার স্পোর্টসকে তিনি বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট জেতা আমার কাছে বিশেষ এক অনুভূতি। মাঠে গিয়ে কন্ডিশন ও উইকেট দেখার পর বোঝা যায় ঠিক কী করতে হবে। একজন খেলোয়াড় হিসেবে এটা জয় আমার স্বপ্নের মতো।’
অস্ট্রেলিয়াকে ডারউইনে ৯ উইকেটে হারালেও ২০২৫-২৭ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চক্রে বাংলাদেশ চারে। শান্তর দলের সফলতার হার ৬৬.৬৭ শতাংশ। অস্ট্রেলিয়ারও অবস্থানের পরিবর্তন হয়নি। ৭৭.৭৮ শতাংশ সফলতার হার নিয়ে শীর্ষে অজিরা। ম্যাকেতে ২২ আগস্ট শুরু হবে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট।