১৮৭২ সালের ৫ ডিসেম্বর উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল ব্রিটিশ বাণিজ্যিক জাহাজ ‘মেরি সেলেস্ট’। জাহাজটিতে তখন কোনো মানুষ ছিল না। অথচ খাবার, মালপত্র ও নাবিকদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র প্রায় অক্ষত অবস্থায় পড়ে ছিল। কোথাও সংঘর্ষ বা সহিংসতার কোনো চিহ্নও পাওয়া যায়নি। যেন মুহূর্তের মধ্যে জাহাজের ১০ আরোহী রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে গিয়েছিলেন। দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই ঘটনাকে ঘিরে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, জলদস্যু হামলা, এমনকি অতিপ্রাকৃত ঘটনার গল্পও প্রচলিত ছিল।
তবে সম্প্রতি ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা দাবি করেছেন, তাঁরা অবশেষে ‘ভূতুড়ে জাহাজ’ খ্যাত মেরি সেলেস্টের রহস্যের সম্ভাব্য সমাধান খুঁজে পেয়েছেন। তাঁদের মতে, জাহাজের ভেতরে ইথানল বাষ্পের ভয়াবহ বিস্ফোরণই আতঙ্কিত করে তুলেছিল নাবিকদের, যার ফলে তাঁরা তড়িঘড়ি করে জাহাজ ত্যাগ করেছিলেন।
গবেষক ও রসায়নবিদ ড. জ্যাক রোবোথাম জানান, মেরি সেলেস্টে প্রায় ১ হাজার ৭০০ ব্যারেল বিশুদ্ধ অ্যালকোহল বা ইথানল বহন করা হচ্ছিল। তদন্তকারীরা জাহাজে উঠে দেখতে পান, এর মধ্যে ৯টি ব্যারেল খালি। ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় ১ হাজার ১০০ লিটার ইথানল জাহাজের ভেতরে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং ধীরে ধীরে তা বাষ্পে পরিণত হয়।
ড. রোবোথামের ভাষ্য অনুযায়ী, ইথানলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ফ্ল্যাশ পয়েন্ট’ রয়েছে, যা প্রায় ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই তাপমাত্রার ওপরে গেলে ইথানল বাষ্পে সহজেই আগুন ধরে যেতে পারে। মেরি সেলেস্ট নিউইয়র্ক থেকে যাত্রা শুরু করেছিল শীতকালে, যখন তাপমাত্রা ছিল কম। কিন্তু জাহাজটি আজোরেসের দিকে অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবহাওয়া উষ্ণ হতে থাকে। একই সময়ে খারাপ আবহাওয়ার কারণে জাহাজের হ্যাচগুলো (ডেকের ওপরে থাকা ঢাকনা) বন্ধ রাখা হয়েছিল। ফলে নিচের অংশে জমতে থাকে বিপজ্জনক ইথানল বাষ্প।
পরে আবহাওয়া যখন স্বাভাবিক হয়, তখন হ্যাচগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং অক্সিজেন ঢুকে তৈরি হয় অত্যন্ত দাহ্য পরিবেশ। গবেষকদের মতে, সামান্য একটি স্ফুলিঙ্গই তখন বিশাল বিস্ফোরণের জন্য যথেষ্ট ছিল।
এই তত্ত্ব যাচাই করতে গবেষকেরা জাহাজটির একটি ক্ষুদ্র মডেল তৈরি করে পরীক্ষা চালান। তারা দেখতে পান, উচ্চ তাপমাত্রায় সামান্য স্পার্ক থেকেই বিস্ফোরণ ঘটে এবং মুহূর্তের মধ্যে নীল আগুনের ঝলক পুরো জাহাজকে গ্রাস করে। তবে আগুনটি এত দ্রুত নিভে যায় যে, জাহাজের ভেতরে থাকা কাঠেও পোড়ার কোনো দাগ থাকে না।
গবেষকদের মতে, বাস্তব ঘটনাতেও এমন বিস্ফোরণই ঘটেছিল। এতে আতঙ্কিত হয়ে নাবিকেরা দ্রুত জাহাজ ছেড়ে পালিয়ে যান। আর সেই কারণেই মেরি সেলেস্টকে পরবর্তীতে প্রায় অক্ষত অবস্থায় সমুদ্রে ভাসতে দেখা যায়।