যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক এবং বিশ্ববিখ্যাত রসায়নবিদ চার্লস লিবার এখন চীনের শেনজেনে নিজের নতুন গবেষণাগার তৈরি করেছেন। মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য গোপন ও কর ফাঁকির অভিযোগে দণ্ডিত হওয়ার তিন বছর পর, ৬৭ বছর বয়সী এই বিজ্ঞানী এখন বেইজিংয়ের অন্যতম জাতীয় অগ্রাধিকারমূলক প্রযুক্তি—‘ব্রেন কম্পিউটার ইন্টারফেস’ (বিসিআই) বা মানুষের মস্তিষ্কে ইলেকট্রনিকস স্থাপনের গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে একটি মার্কিন জুরি চার্লস লিবারকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি চীনের ‘থাউজেন্ড ট্যালেন্টস’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করেছেন। তবে ফেডারেল তদন্তকারীদের কাছে তা অস্বীকার করেছিলেন। দুই দিন জেল এবং ছয় মাস গৃহবন্দী থাকার পর বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ এই রসায়নবিদ হার্ভার্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তবে ২০২৫ সালের এপ্রিলে তিনি চীনে পাড়ি জমান।
চার্লস লিবার বর্তমানে শেনজেনের ‘আই-ব্রেন’ (i-BRAIN) ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। এটি ‘শেনজেন মেডিকেল একাডেমি অব রিসার্চ অ্যান্ড ট্রান্সলেশন’ (স্মার্ট)-এর একটি অংশ। লিবার শেনজেনে এক সম্মেলনে বলেন, ‘আমি ২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল মাত্র কয়েক ব্যাগ কাপড় আর এক বুক স্বপ্ন নিয়ে এখানে এসেছিলাম। আমার লক্ষ্য শেনজেনকে এই প্রযুক্তিতে বিশ্বসেরা করা।’
লিবার যে প্রযুক্তিতে বিশেষজ্ঞ, তা মূলত পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের মতে, এর বড় ধরনের সামরিক প্রয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘সুপার সোলজার’ তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। এর মাধ্যমে সেনাদের মানসিক শক্তি এবং পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব, যা যুদ্ধক্ষেত্রে অজেয় শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, হার্ভার্ডে লিবার যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেতেন না, শেনজেনে তাঁকে তার চেয়েও উন্নত ল্যাবরেটরি ও বিপুল সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে: লিবারের ল্যাবে এখন নেদারল্যান্ডসের এএসএমএল কোম্পানির তৈরি ডোপ আল্ট্রাভায়োলেট লিথোগ্রাফি সিস্টেম রয়েছে, যা অত্যাধুনিক চিপ তৈরিতে অপরিহার্য। হার্ভার্ডে তাঁকে সাধারণ ব্যবহারকারীদের সঙ্গে যন্ত্রপাতি ভাগাভাগি করতে হতো। লিবারের ল্যাবে ২ হাজার শিম্পাঞ্জি বা প্রাইমেটের ওপর গবেষণার সুযোগ রয়েছে। মানুষের মস্তিষ্কে চিপ স্থাপনের আগে এই পর্যায়ে সফল ট্রায়াল অত্যন্ত জরুরি। উল্লেখ্য, পশুপাখি সুরক্ষার চাপে হার্ভার্ড তাদের প্রাইমেট রিসার্চ সেন্টার ২০১৫ সালে বন্ধ করে দিয়েছিল। এ ছাড়া শেনজেন সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত ‘স্মার্ট’-এর ২০২৬ সালের বাজেট প্রায় ১৫৩ মিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের তুলনায় ১৮ শতাংশ বেশি।
সাবেক এনএসএ কর্মকর্তা গ্লেন গারস্টেল রয়টার্সকে বলেন, ‘চীন আমাদের উদ্ভাবন এবং উন্মুক্ত নীতির সুযোগ নিয়ে আমাদের বিরুদ্ধেই সেটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।’ বিশ্লেষকদের মতে, লিবারের এই ঘটনা প্রমাণ করে যে মার্কিন আইনগুলো স্পর্শকাতর প্রযুক্তি সুরক্ষায় কতটা ব্যর্থ। লিবার যখন এফবিআইয়ের হাতে গ্রেপ্তার হন, তখন তিনি জানিয়েছিলেন, তিনি কেবল ‘নোবেল পুরস্কার’ জিততে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর এই ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা এখন ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার প্রযুক্তিগত স্নায়ুযুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
চীন নতুন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ‘ব্রেন কম্পিউটার ইন্টারফেস’ প্রযুক্তিকে জাতীয় প্রবৃদ্ধির অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছে। চীনের ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিফর্ম কমিশনের মতে, আগামী ১০ বছরে এই খাতটি চীনের উচ্চ প্রযুক্তি খাতের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হয়ে উঠবে। শেনজেনের এই ল্যাবে লিবার ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে আসা অন্তত আরও ছয়জন উচ্চপর্যায়ের গবেষক যোগ দিয়েছেন। এই ঘটনাকে বেইজিংয়ের ‘ট্যালেন্ট রিক্রুটমেন্ট’ কৌশলের বড় জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।