হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের বিষয়ে গতকাল মঙ্গলবারও বড় কোনো স্বস্তির খবর মেলেনি। আগের মতোই আছেন তিনি। অধিকতর ভালো চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে নেওয়ার প্রস্তুতি থাকলেও তাঁর শারীরিক অবস্থার বর্তমান পরিস্থিতিতে এখনই তা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
গত ২৩ নভেম্বর থেকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়া। এর মধ্যে তিন দিন ধরে তাঁকে রাখা হয়েছে আইসিইউতে।
খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এ জেড এম জাহিদ হোসেন গতকাল দুপুরে এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে সাংবাদিকদের বলেন, ‘ডাক্তাররা যে চিকিৎসা দিচ্ছেন, সেই চিকিৎসা উনি (খালেদা জিয়া) গ্রহণ করতে পারছেন। অথবা আমরা যদি বলি, উনি মেইনটেইন করছেন।’
মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শে প্রয়োজনে বিএনপির চেয়ারপারসনকে দেশের বাইরে নেওয়ার প্রস্তুতি আছে জানিয়ে জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের সকল প্রস্তুতি আছে। কিন্তু সর্বোচ্চটা মনে রাখতে হবে যে রোগীর বর্তমান অবস্থা এবং সর্বোপরি মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শের বাইরে কোনো কিছু করার সুযোগ এই মুহূর্তে আমাদের নেই।’
এ সময় খালেদা জিয়াকে নিয়ে ছড়িয়ে পড়া গুজবে কান না দেওয়ারও আহ্বান জানান জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘সবাইকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন এবং কোনো ধরনের গুজব ছড়ানো এবং গুজবে কান না দেওয়ার জন্য বিনীতভাবে পরিবারের পক্ষ থেকে, দলের পক্ষ থেকে অনুরোধ করছি।’
এর আগে গত সোমবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির নিয়মিত বৈঠকেও খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। দলীয় সূত্র বলছে, চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে দেশের বাইরে নেওয়ার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হয় বৈঠকে। তবে সিদ্ধান্ত হয়, মেডিকেল বোর্ড পরামর্শ দিলেই কেবল তাঁকে দেশের বাইরে নেওয়া হবে।
এদিকে, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার ওপর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরার বিষয়টি নির্ভর করছে বলে জানিয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি গতকাল গণমাধ্যমকে বলেন, সংকটাপন্ন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন তারেক রহমান। এর ওপর ভিত্তি করেই তিনি দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেবেন।
তবে মির্জা ফখরুল এ কথাও বলেন, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা অপরিবর্তিত থাকলে শিগগিরই তারেক রহমান দেশে ফিরবেন।
এর আগে সোমবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির নিয়মিত বৈঠক শেষে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের জানান, খুব শিগগিরই দেশে ফিরবেন তারেক রহমান।
অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (ভিভিআইপি) ঘোষণা
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ সভায় গতকাল বিএনপির চেয়ারপারসনের রোগমুক্তি কামনা করে দোয়া করা হয়। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় খালেদা জিয়ার বর্তমান শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় হাসপাতালে তাঁর নির্বিঘ্ন চিকিৎসা, প্রয়োজনে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা, তাঁর নিরাপত্তা ও যাতায়াতের সুবিধা এবং উচ্চ মর্যাদা বিবেচনায় তাঁকে রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (ভিভিআইপি) ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এদিকে খালেদা জিয়াকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ ঘোষণা করার পর স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ) নিরাপত্তা দেওয়া শুরু করেছে। গতকাল বেলা ২টার দিকে এসএসএফ সদস্যদের গাড়ি এভারকেয়ার হাসপাতালে ঢুকতে দেখা যায়। বিষয়টি নিশ্চিত করেন বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান।
তারেক রহমানের কৃতজ্ঞতা
খালেদা জিয়ার সুস্থতায় সহযোগিতা ও শুভকামনার জন্য জিয়া পরিবারের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতার জন্য যেভাবে সহযোগিতা ও শুভকামনা জানানো হচ্ছে, জিয়া পরিবার ও বিএনপির পক্ষ থেকে আমরা সবার প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দ, কূটনীতিকবৃন্দ ও বন্ধুগণের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা, পাশাপাশি বাংলাদেশের মানুষের অপরিসীম ভালোবাসা ও দোয়া—সবকিছু আমাদের আবেগ ও অনুভূতিকে গভীরভাবে স্পর্শ করছে।’
পোস্টে তারেক রহমান আরও বলেন, ‘দেশবাসীর সম্মিলিত সমর্থনই আমাদের পরিবারের শক্তি ও প্রেরণার উৎস। মমতাময়ী দেশনেত্রীর দ্রুত আরোগ্যের জন্য আমরা সবাই নিরন্তর দোয়া করছি। এই কঠিন সময়ে ঐক্য, সহমর্মিতা ও সংহতির জন্য প্রতিটি মানুষের প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতা রইল।’
দেখতে গেলেন তিন বাহিনী প্রধান
খালেদা জিয়াকে দেখতে গতকাল রাতে এভারকেয়ার হাসপাতালে যান সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন। বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান এ তথ্য জানান।
দোয়া-প্রার্থনা অব্যাহত
খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে জিয়াউর রহমান সমাজকল্যাণ পরিষদ। সেখানে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ঘিরে যেন গোটা দেশের বাতাসও আজ কাঁদছে। দেশের বাইরে যেখানেই বাংলাদেশিরা আছেন, সেখানেই মানুষ তাঁর জন্য দোয়া করছেন।
দোয়া মাহফিলে আরও উপস্থিত ছিলেন আয়োজক সংগঠনের সভাপতি গিয়াস উদ্দিন খোকন, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মাওলানা নেছারুল হক, দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি কে এম রকিবুল ইসলাম রিপনসহ সংগঠনটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা।
খালেদা জিয়ার আরোগ্য কামনায় মিলাদ মাহফিল করেছে জাতীয় প্রেসক্লাব। গতকাল বাদ আসর ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে এ মিলাদ অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূইয়া।