ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ক্ষমতায় আসা বিএনপি স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সাফল্য পেতে চায়। সে জন্য দল শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি তৃণমূল পর্যন্ত নেতা-কর্মীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে কেন্দ্র থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশ পেয়ে তাঁরা সরবও হয়েছেন। বিএনপির নেতাদের সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকে স্থানীয় সরকারের সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধী দলগুলো এই নির্বাচনের দাবি তুলেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কিছু জায়গায় দলীয় প্রার্থীও ঘোষণা করেছে। চলতি বছরেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরুর আভাস পাওয়া গেছে। নির্বাচন কমিশনেরও (ইসি) স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি রয়েছে। সরকারের কাছ থেকে সিদ্ধান্ত পেলে ইসি তফসিল ঘোষণা করবে বলে জানা গেছে।
বিএনপির একটি সূত্র বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণের ঘোষণা পাওয়া না গেলেও চলতি বছরের শেষের দিকে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে বিএনপি পরীক্ষা হিসেবে নিয়ে সংসদ নির্বাচনের মতো বড় সাফল্য পেতে চায়। তবে সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে এই নির্বাচনের ধরনগত পার্থক্য থাকায় বড় সাফল্যের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে হবে। কারণ, এখানে স্থানীয় অনেক বিষয়ও প্রভাব রাখে। তাই বড় সাফল্যের জন্য আগেভাগেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে এরই মধ্যে নির্দেশ গেছে। নির্দেশমতো দলের তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা সরব হয়েছেন। বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা অনানুষ্ঠানিক গণসংযোগ শুরু করেছেন। নিজ এলাকায় বিভিন্ন উপলক্ষ ঘিরে পোস্টার, ফেস্টুন, ব্যানার টানাচ্ছেন। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেও ব্যবহার করছেন তাঁরা।
স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে দলের প্রস্তুতি আছে জানিয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা হওয়ার পর পূর্ণ শক্তি নিয়ে নেতা-কর্মীরা ভোটের মাঠে নামবেন। সরকারের অর্জনগুলো জনমনে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে দাবি করে নির্বাচনে দলীয় নেতাদের জয়ের ব্যাপারেও আশাবাদ জানান তিনি।
বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, স্থানীয় পর্যায়ে শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করতে না পারলে জাতীয় পর্যায়ে জনপ্রিয়তা কমতে পারে। এ কারণে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন দল ও সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় নির্বাচনে জাতীয় নির্বাচনের সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে কার্যকর কৌশল নিতে হবে। জাতীয় নির্বাচনে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এবং সরকারবিরোধী জনমত বড় ভূমিকা রাখলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রাধান্য পায় ব্যক্তির জনপ্রিয়তা, আঞ্চলিক সমীকরণ, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং স্থানীয় নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা। এবার স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকছে না। ফলে ভোটে এসব বিষয় প্রাধান্য পাবে। এদিকে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি এই নির্বাচনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াবে।
বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলও নীতিনির্ধারকদের ভাবাচ্ছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অর্ধশতাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এ কারণে বিএনপি বেশ কিছু আসনে পরাজিত হয়েছে। সরকার গঠনের পরও বিভিন্ন স্থানে নানা কারণে কোন্দল রয়েছে; যা স্থানীয় নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ জন্য দলের স্বার্থে কোন্দল ভুলে নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা চলছে।
অবশ্য বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে দলের নেতা-কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ রয়েছেন। তাঁরা বলছেন, বিএনপি সরকার গঠনের পর গত তিন মাসে জনগণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী নতুন নতুন ধারা সৃষ্টি করছেন। তিনি যে বাংলাদেশ গড়তে যাচ্ছেন, দলের নেতা-কর্মীরাও সেই পথেই এগোচ্ছেন। জনগণ বিএনপির পাশে আছে এবং স্থানীয় নির্বাচনেও জনগণ বিএনপিকে যথাযথ মূল্যায়ন করবে।
বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘নির্বাচনে প্রতিপক্ষ থাকবে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবেই। প্রতিপক্ষকে সমীহ করেই আমরা কাজ করতে চাই। কারণ, তৃণমূলের ভোট। দলীয় প্রতীক নেই। তবে আমরা বিশ্বাস করি, জনগণ আমাদের সঙ্গে থাকবে।’
দলের জাতীয় কাউন্সিল ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে ঘর গোছানোর অংশ হিসেবে এবার ঢাকা মহানগরকে ঢেলে সাজাচ্ছে বিএনপি। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির নেতৃত্বে বেশ কিছু নতুন মুখও দেখা যেতে পারে। সব ঠিক থাকলে পবিত্র ঈদুল আজহার পরেই এই উদ্যোগের প্রতিফলন দৃশ্যমান হতে পারে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
বিএনপির সূত্রগুলো বলছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির কমিটির মেয়াদ শেষ না হলেও সংসদ নির্বাচনে ঢাকা মহানগরের দুজন নেতা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এ ছাড়া একজনকে টেকনোক্র্যাট কোটায় প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে। মহানগর কমিটির তিনজন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এ অবস্থায় সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগেই ঢাকার দুই মহানগরের সাংগঠনিক শক্তি জোরদার করতে চায় বিএনপি। ৯ মে কেন্দ্রীয় বিএনপিসহ সাংগঠনিক ইউনিটের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বিএনপির চেয়ারম্যানও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড গতিশীল করার তাগিদ দিয়েছেন। ঢাকা মহানগর কমিটিতে যুক্ত হতে আগ্রহীরা জোর লবিং ও তদবির শুরু করেছেন বলেও জানা গেছে।