দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, জেলা ও মহানগরে সদ্য গঠিত কমিটি নিয়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে ক্ষোভ, অসন্তোষ ও কোন্দল প্রকাশ্য হয়েছে। কমিটি গঠনে আর্থিক লেনদেনসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন পদবঞ্চিতরা। দেশের বিভিন্ন স্থানে সংক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ করেছেন। ক্ষোভ-হতাশায় সংগঠন থেকে বেশ কয়েকজনের পদত্যাগের খবরও পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং জেলা ও মহানগরে অর্ধশতাধিক কমিটি ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন স্বাক্ষরিত পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে এসব কমিটি ঘোষণা করা হয়। এর পর থেকে পদবঞ্চিতরা কমিটি বাতিলের দাবিতে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ করছেন।
বিভিন্ন কমিটি নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেছেন, এসব কমিটি নিয়ে অল্প কিছু অভিযোগ এলেও যাচাই-বাছাই করা হবে। যাচাই-বাছাই চলছে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাঙামাটি জেলা ছাত্রদলের আংশিক কমিটিতে অছাত্র, বিবাহিতদের পদ দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন পদবঞ্চিতরা। তাঁরা এই কমিটি বাতিলের দাবিতে গত রোববার রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ ও অবরোধ করেন। নোয়াখালীতে জেলা ও পৌর ছাত্রদলের কমিটি বাতিলের দাবিতে সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। জেলা ছাত্রদলের ৩৭ সদস্যের কমিটি প্রত্যাহারের দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ মিছিল করেন ছাত্রদলের পদবঞ্চিত নেতারা। কমিটির ১০ জন পদত্যাগও করেছেন। গতকাল পদবঞ্চিতরা সমাবেশ থেকে ওই কমিটি বিলুপ্ত করে যোগ্য নেতাদের নেতৃত্বে নতুন কমিটি ঘোষণার জন্য বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
কক্সবাজারে নতুন কমিটি নিয়ে অসন্তোষ থেকে স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ করেন পদবঞ্চিতরা। কমিটিতে পদ না পেয়ে ছাত্রদলের এক কর্মীর ফেসবুক লাইভে কান্নাকাটির ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। অন্যান্য স্থানেও অসন্তোষ রয়েছে বলে জানা গেছে।
বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠনের দুই মাস পর ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে বিভিন্ন স্থানে অভিযোগ, বিক্ষোভ, অপ্রীতিকর ঘটনায় দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মনে করছেন ছাত্রসংগঠনটির অনেক নেতা-কর্মী।
ছাত্রদলের অনেক নেতা-কর্মীর অভিযোগ, যথাযথ যাচাই-বাছাই না করে গঠিত এসব কমিটিতে শীর্ষ নেতাদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে। ফলে ত্যাগী ও পরীক্ষিত অনেকের মূল্যায়ন হয়নি। অছাত্র, ব্যবসায়ী এবং ‘নব্যদের’ কমিটিতে পদায়ন করা হয়েছে। বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে যে সংখ্যক কর্মী ছিলেন, তার চেয়ে অন্তত ৭-৮ গুণ বেশি নেতা-কর্মীকে পদায়ন করা হয়েছে। কমিটি গঠনে জ্যেষ্ঠতার বিষয়টি মানা হয়নি। শ্রম-ত্যাগের মূল্যায়ন করা হয়নি। কমিটিতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ, ছাত্রশিবির ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা-কর্মীদেরও পুনর্বাসন করা হয়েছে।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় দপ্তরের সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত ছাত্রলীগ, ছাত্রশিবির ও এনসিপির অন্তত দুই হাজার নেতা-কর্মী ছাত্রদলে অনুপ্রবেশ করেছেন। সম্প্রতি ছাত্রদলের যেসব ইউনিটের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে, সেগুলোতে ছাত্রলীগের অন্তত ৯৭ জন এবং এনসিপির অন্তত ২৯ জন নেতা-কর্মী রয়েছেন।
পদবঞ্চিতদের অভিযোগ, কমিটি গঠনে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। শুধু গ্রুপিংয়ের কারণে যোগ্য অনেকে কমিটিতে স্থান পাননি। এতে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
কক্সবাজার জেলা ছাত্রদলের কমিটি গঠন নিয়ে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন জেলা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মিজানুল আলম। তিনি বলেন, ‘কক্সবাজার জেলা ছাত্রদলের কমিটি মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে হয়েছে। এখানে আমরা বৈষম্যের শিকার হয়েছি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে যাঁদের ভালো সম্পর্ক, তাঁদের কমিটিতে রাখা হয়েছে।’
নাম প্রকাশ না করে ছাত্রদলের পদবঞ্চিত এক নেতা বলেন, সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে নেতা-কর্মীরাই বাজে স্লোগান দিচ্ছেন। এটা কাম্য নয়। এই কমিটিগুলো আরও ছয় মাস আগে দেওয়া উচিত ছিল।
শীর্ষ নেতৃত্বের দিকে প্রশ্ন তুলে ছাত্রদলের একাধিক নেতা বলেন, যাঁরা সফলতার সুফল নিতে চান, ব্যর্থতার দায়ও তো তাঁদের নিতে হবে। সেটা তো কারও ওপর চাপিয়ে দিলে হবে না। কয়েকজন বলেন, এই বিক্ষোভ-অসন্তোষে ফায়দা লোটার সুযোগ তৈরি হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রসংগঠনগুলোর।
বিভিন্ন কমিটি গঠন নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সরকারকেও বিব্রতকর অবস্থায় ফেলছে বলে মন্তব্য করেছেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় কমিটি দেওয়া হয়েছে। তবে যে প্রক্রিয়ায় দেওয়া হয়েছে, সেটা ঠিক হয়নি। অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে কমিটি করা উচিত ছিল। ঘোষিত কমিটি পুনর্মূল্যায়নের দাবি রাখে।
অবশ্য ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের দাবি, যাচাই-বাছাই করেই কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। কমিটি গঠন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা ৫০টির বেশি কমিটি দিয়েছি। বাংলাদেশের ইতিহাসে ৫০টির বেশি কমিটি দেওয়া একটা বিরল ঘটনা। এসব কমিটিতে কয়েক হাজার নেতা-কর্মীকে পদায়ন করা হয়েছে। যদি অল্প কিছু, নগণ্যসংখ্যক অভিযোগ আসে, অবশ্যই যাচাই-বাছাই করতে হবে। আমরা যাচাই-বাছাই করছি এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।’