আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে ১১ দলীয় রাজনৈতিক জোটের অন্দরে আসন সমঝোতা নিয়ে এক চরম নাটকীয়তা তৈরি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে এই জোটে শরিকদের মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা গতকাল মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত কাটেনি। বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সঙ্গে জামায়াতের রশি টানাটানির কারণে সমঝোতা প্রক্রিয়াটি ঝুলে আছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই টানপোড়েন কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক নয়, বরং জোটের ভেতরে নিজেদের রাজনৈতিক গুরুত্ব প্রমাণের এক কঠিন লড়াই।
আসন সমঝোতা নিয়ে গতকাল জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ পৃথক বৈঠক করেছে। আজ বুধবার (১৪ জানুয়ারি) দুপুরে যৌথ বৈঠকে বসবেন ১১ দলের শীর্ষ নেতারা। এরপর আসন সমঝোতার চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হবে বলে জোট সূত্রে জানা গেছে।
সমঝোতার বর্তমান চিত্র: আট বনাম তিন
জোটের ১১টি দলের মধ্যে আটটির সঙ্গে জামায়াতের আসন সমঝোতা একপ্রকার চূড়ান্ত হয়ে গেছে। কিন্তু ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সঙ্গেই মূল বিরোধ রয়ে গেছে। গতকাল দিনভর দফায় দফায় বৈঠকের পরও যখন ঐকমত্যে পৌঁছানো যায়নি, তখন উভয় দলই তাদের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘শুরা কাউন্সিল’-এর জরুরি বৈঠক ডেকেছে। গত সোমবার থেকেই লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকগুলোতে উত্তাপ ছড়াচ্ছিল, যা মঙ্গলবার রাতে এসে চূড়ান্ত ‘অচলাবস্থা’র রূপ নেয়।
ইসলামী আন্দোলনের অসন্তোষ: সংখ্যা যখন মর্যাদার লড়াই
সমঝোতার টেবিলে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। শুরুতে তারা শতাধিক আসনের দাবি নিয়ে মাঠে নামলেও দর-কষাকষির একপর্যায়ে ৫০টি আসনের নিচে নামতে রাজি নয়। অন্যদিকে জামায়াত কোনোভাবেই তাদের ৪০টির বেশি আসন ছাড় দিতে আগ্রহী নয়। দলীয় সূত্র বলছে, ইসলামী আন্দোলনের বড় একটি অংশ মনে করছে, আসনসংখ্যা যদি ৪০-এর ঘরেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সেটি তাদের সাংগঠনিক শক্তির অবমূল্যায়ন হবে। এই অসন্তোষ নিরসনেই গতকাল সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দলটির শুরা কাউন্সিল বৈঠক করেছে। বৈঠকে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ের সভাপতি-সম্পাদকেরাও অংশ নেন। প্রেসিডিয়াম সদস্য আশরাফ আলী আকন ও যুগ্ম মহাসচিব শেখ ফজলে বারী মাসউদের মতো জ্যেষ্ঠ নেতারাও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে অপারগতা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস: ‘উন্মুক্ত’ প্রার্থিতার হুমকি
এদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সঙ্গেও জামায়াতের টানপোড়েন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দলটি ২৫ থেকে ৩০টি আসন দাবি করলেও জামায়াত তাদের সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ২০টি আসনে ছাড় দিতে চায়। দলটির একাধিক নেতার বক্তব্যে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। তাঁরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, কাঙ্ক্ষিত আসন না পেলে এবং সমঝোতা না হলে যে আসনগুলোতে জামায়াত ছাড় দেবে না, সেখানে তাঁরা ‘উন্মুক্ত’ প্রার্থী দেওয়ার কথা ভাবছেন। জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মাওলানা ইউসুফ আশরাফ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আসন সমঝোতা নিয়ে জামায়াত এখনো তাদের অনড় অবস্থানেই আছে। আজ বুধবার বেলা ১১টায় দলটির শুরা কাউন্সিলের বৈঠক থেকে এই বিষয়ে চরম কোনো সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে জানা যাচ্ছে।
জামায়াতের অবস্থান ও প্রস্তাবিত বণ্টন কাঠামো
জামায়াতে ইসলামীর প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের অবশ্য আশাবাদী। তাঁর মতে, দু-একটি আসন নিয়ে যে সাময়িক ঝামেলা তৈরি হয়েছে, সেটি শীর্ষ নেতাদের হস্তক্ষেপে ঠিক হয়ে যাবে। অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জামায়াতের প্রস্তাবিত খসড়া তালিকায় দলগুলোর অবস্থান এমন:
সবচেয়ে বড় অংশ হিসেবে ইসলামী আন্দোলনকে ৪০টি এবং জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) ৩০টি আসন ছাড় দিতে চায় জামায়াত। এ ছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ১৫টি এবং খেলাফত মজলিসকে ৭টি আসন দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি বা এলডিপির জন্য ৪ থেকে ৭টি আসনের সুযোগ রাখা হয়েছে। তুলনামূলক ছোট দলগুলোর মধ্যে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ৩টি এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) ২টি আসন পেতে পারে বলে জানা গেছে। এনসিপি ইতিমধ্যে তাদের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করার ইঙ্গিত দিয়েছে এবং আজই তারা সংবাদ সম্মেলন করতে পারে।
আজ বুধবার বিকেলে জামায়াত সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে চূড়ান্ত তালিকা ঘোষণা করবে বলে জানিয়েছে। তবে প্রশ্ন হলো, ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিস কি এই ‘সংকুচিত’ তালিকায় তুষ্ট হবে? নাকি শেষ মুহূর্তে জোটের সমীকরণে কোনো বড় ধাক্কা আসবে? যদি কোনো বড় শরিক দল জোটের সিদ্ধান্ত মেনে না নেয়, তবে নির্বাচনী মাঠে এককভাবে প্রার্থী দেওয়ার ঘটনা জোটের সংহতিকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলবে। সব মিলিয়ে ১১ দলের এই আসন সমঝোতার ভবিষ্যৎ এখন ঝুলে আছে আজকের শুরা কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত এবং জামায়াতের নমনীয়তার ওপর।