হোম > মতামত > সম্পাদকীয়

পরের জায়গা, পরের জমি

সম্পাদকীয়

‘পরের জাগা পরের জমি, ঘর বানাইয়া আমি রই/আমি তো সেই ঘরের মালিক নই’—এমন সরল স্বীকারোক্তি দেওয়ার মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এই যেমন, বাবুলাল টুডুর জমিতে ঘর বানিয়ে থাকে অন্য দুই পরিবার, যারা দাবি করে ওই জায়গা তাদের। আর তাঁর আশ্রয় হয়েছে আত্মীয়ের বাড়ি। অথচ বাবুলাল টুডু প্রমাণ নিয়েই দ্বারস্থ হয়েছেন প্রশাসনের কাছে।

ভূমিহীন মানুষের পুনর্বাসনের জন্য সরকার খাসজমি বন্দোবস্ত দেয়। উদ্দেশ্য একটাই—যাঁর নিজের কোনো জমি নেই, তাঁকে মাথা গোঁজার ঠাঁই ও জীবিকার একটি ভিত্তি দেওয়া। ৩৬ বছর আগে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের ভূমিহীন বাবুলাল টুডুকে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চাত্রাপুকুর গ্রামে শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু সেই সময়েই তাঁর জমিটি বেদখল হয়ে যায়। সেখানে দুটি বাড়ি নির্মাণ করে বাস করছে প্রভাবশালী দুই পরিবার।

নিজের জমি বুঝে পেতে গত বছর বাবুলাল জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন। বিষয়টি গেছে উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) দপ্তরে। সেই দপ্তর থেকে যে সার্ভেয়ারকে পাঠানো হয়, তিনি সরেজমিনে নিশ্চিতও হয়েছেন ভুক্তভোগীর জমিটি বেদখল হয়ে গেছে। আর বাবুলাল সাত সদস্যের পরিবার নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন আত্মীয়ের জমিতে, ছোট তিনটি মাটির ঘরে। এখন জেলা প্রশাসকের অনুমোদন পেলেই অবৈধ দখলদারকে উচ্ছেদ করে জমির মালিককে সেই জমি বুঝিয়ে দেওয়া যাবে। সে পর্যন্ত অপেক্ষা...।

কিন্তু সংশয় এবং শঙ্কা রয়ে যায়—প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে বাবুলালের জমি বেদখলই থাকবে না তো? কারণ, এত বছরেও প্রভাবশালীদের দখলদারত্বের সংস্কৃতিকে প্রশাসন ভাঙতে পারেনি। এবারও যদি না পারে? তাহলে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার নির্মম চিত্রের উৎকৃষ্ট উদাহরণ হবে ঘটনাটি। প্রশাসনের চোখের সামনে সরকারি বন্দোবস্তের জমি কীভাবে বেদখল হলো, সেটাও জানা হলো না।

এর আগেও ২০২৩ সালে বাবুলাল জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছিলেন। তখনো তদন্তে তাঁর জমির অবস্থান ও বন্দোবস্তের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছিল। এমনকি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, তাঁর নামে কবুলিয়ত দলিল রেজিস্ট্রির আদেশ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু তিন বছর পেরিয়ে গেলেও জমি বুঝে পাননি তিনি। অর্থাৎ কাগজে রাষ্ট্র তাঁর পাশে থাকলেও বাস্তবে তিনি রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত।

শুধু বাবুলালই একা ভুক্তভোগী নন, সেই প্রভাবশালীরা পাশের খাসজমিও দখলের চেষ্টা করছেন। স্থানীয়দের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ উঠেছে তাঁদের বিরুদ্ধে। মনে হচ্ছে, ভূমিদখলের একটি বৃহত্তর প্রবণতা রয়েছে অভিযুক্তদের মধ্যে।

আমরা আশা করব, এবার আর তদন্ত, প্রতিবেদন ও অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতায় বিষয়টি আটকে থাকবে না। ৩৬ বছর অপেক্ষার পর একজন ভূমিহীন মানুষের কাছে আরেকটি আবেদন করতে বলা নিষ্ঠুরতার শামিল। বরং রাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিশ্রুতির মর্যাদা রক্ষা করতে সসম্মানে বাবুলালের জমি ফিরিয়ে দিতে হবে অতিদ্রুত, আশঙ্কা দূর করতে হবে অন্য অভিযোগকারীদের। দখলদার যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, নিশ্চয়ই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।