মানুষ কতটা অমানবিক হয়ে গেছে, তার একটি উদাহরণ তৈরি হয়েছে পিরোজপুরের নেছারাবাদে। স্রেফ চারটি সুপারির চারা খেয়েছিল তিনটি ছাগল। সেই অপরাধে ছাগল তিনটির পাগুলো এক করে বেঁধে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। দুটি ছাগল মারা গেছে এবং একটি ছাগল মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রামের একজন দরিদ্র কৃষকের সম্বলই ছিল এই তিনটি ছাগল।
যাঁর সুপারির চারা খেয়েছিল ছাগল তিনটি, তিনি যদিও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, কিন্তু ছাগলগুলোর সঙ্গে এহেন আচরণ নিশ্চয় সুদূর মহাশূন্য থেকে আসা কোনো এলিয়েন করেনি। তাই ঘটনাটির সুষ্ঠু বিচারের ব্যবস্থা করা উচিত।
পাঠক ভাবতে পারেন, রাজনীতির মাঠে এত বড় বড় ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, অথচ সে বিষয়গুলো নিয়ে সম্পাদকীয় না লিখে পিরোজপুরের তিন ছাগল নিয়ে হঠাৎ সম্পাদকীয় লিখতে হচ্ছে কেন? ভাবতে পারেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক যে জটিল হয়ে উঠল, তা নিয়েও উচ্চবাচ্য কেন করা হলো না।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িটির সামনে কতিপয় মব-সন্ত্রাসী যখন শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষদের নাজেহাল করল, তখন পুলিশ কেন নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকল, তা নিয়েও কেন কিছু বলা হলো না। নিদেনপক্ষে রাজশাহীর এক কলেজশিক্ষক বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে তাঁর ছবি দিয়ে ‘বিনম্র শ্রদ্ধা’ লিখেছিলেন ফেসবুকের পোস্টে। তারই জের ধরে সেই শিক্ষক চারঘাট উপজেলার নন্দনগাছী কলেজের প্রভাষক সোহেলী আক্তারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই সাময়িক বরখাস্ত করেছে কলেজের গভর্নিং বডি।
কিংবা পাঠক বলতে পারেন, বিএনপির ১৮০ দিনের সাফল্য নিয়ে যে ই-বুক প্রকাশ করেছে বিএনপি, তাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি খাতে তাদের ব্যর্থতা নিয়ে কোনো কথা নেই কেন, সে প্রশ্নও তোলা হলো না কেন। শিশুদের হাম নিয়ে যা ঘটে গেছে, তাও কেন ই-বুকের লেখকেরা ভুলে গেলেন, সে প্রশ্নও তো তোলা উচিত ছিল।
প্রশ্নগুলোর কোনো সহজ উত্তর নেই। আমাদের মনে হয়েছে, সাধারণ মানুষ এই বিষয়গুলো নিয়ে কী ভাবছে, তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দিকে চোখ রাখলেই বিলক্ষণ বোঝা যায়। এককালে রাজনীতিবিদেরা সরকারকে ‘দেয়াল লিখন’ পড়ার আহ্বান জানাতেন। দেয়াল লিখনেই জনসাধারণের মনের কথাটা ফুটে উঠত। সময় পাল্টে গেছে। এখন দেয়াল লিখনের জায়গা নিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। মুহূর্তের মধ্যে কোনো ঘটনার বর্ণনা ছড়িয়ে যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। চাইলেও তা লুকিয়ে ফেলার কোনো পথ নেই। তাই জোরজুলুম, যথেচ্ছাচারের জবাব জনগণই দেয় তাদের নিজস্ব ঢঙে। আবার ভালো কাজের প্রশংসাও তারা করে সেই একই জায়গায়।
মুশকিল হলো, সুপারির চারা খাওয়া ছাগলদের নিয়ে লেখার কেউ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা আলোড়ন তোলে না। সুপারির চারা খাওয়ার অপরাধে ছাগলদের সলিল সমাধি নিশ্চিত করার কথা যারা ভাবতে পারে, তাদের মনুষ্যত্ব যে হারিয়ে গেছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। গরিব কৃষক কি তাঁর ছাগল হত্যার বিচার পাবেন?
বড় বড় ঘটনার পাশাপাশি এই ছোট ছোট ঘটনাও জানান দেয়, আমাদের মানবিক বোধের কতটা অবনমন হয়েছে।