নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার মতো দুঃখজনক আরও একটি ঘটনা ঘটল কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে। মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগে ২০ বছর বয়সী এক তরুণকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে বেধড়ক পেটানোহয়েছে। তাতে ছেলেটির একটি পা ভেঙে গেছে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় ছেলেটি এখন আছে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে।
যত যুক্তিই দেওয়া হোক, সভ্য সমাজে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কী এক সময় এল, যখন চোর সন্দেহে কাউকে ধরা হলেই বেধড়ক পেটানো হচ্ছে। অভিযোগ যাচাই করার আগেই যেভাবে তাকে মারধর করা হচ্ছে, তা কোনো সভ্য সমাজের পরিচায়ক নয়। কাউকে মারধর করে খুন করে ফেলা হচ্ছে, কেউ মুমূর্ষু অবস্থায় বেঁচে গিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কিন্তু অভিযোগ যাচাই করে যদি চুরির প্রমাণও পাওয়া যায়, তাহলেও তো চোরকে মারপিট করার অধিকার নেই কারও। আদালতে সোপর্দ করার পর বিচারের ভার থাকবে বিচারকের ওপর—এটাই সভ্য সমাজের রীতি। যারা নৃশংসভাবে চোরকে মারছে, তারা প্রত্যেকেই অন্যায়কারী। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
এই তো কিছুদিন আগে পিঠে ইটের পরে ইট তুলে দেওয়া একজনকে চোখের সামনে মরে যেতে দেখল হামলাকারীরা। একটি জ্যান্ত মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলার পরও কোনো ধরনের অনুশোচনা হয় না মানুষের—এ তো মানসিক ভারসাম্যহীনতার উদাহরণ। এই প্রবণতাকে রোধ করতে হবে। নইলে ভবিষ্যতে যে প্রজন্ম আসবে, তাদের জীবনে সবকিছুই থাকবে, শুধু থাকবে না মনুষ্যত্ব। আর মনুষ্যত্ব না থাকলে মানুষ হয়ে জন্মানোর কোনো অর্থ হয় না।
এ প্রসঙ্গে আলোচনা করা দরকার, কেন মানুষের সহনশীলতা কমে যাচ্ছে? কেন মানুষ নিজের হাতে তুলে নিতে চাইছে আইন? মানুষের এই রকম অরাজক হয়ে ওঠার বেশকিছু মনস্তাত্ত্বিক কারণ আছে। একটি বড় কারণ হলো, আইনের ওপর আস্থা কমে যাওয়া। অনেকেই এখন মনে করতে শুরু করেছেন, চোর ধরে পুলিশে দিলে কী হবে? আদালতে মামলা হলেও তো বছরের পর বছর চলে যাবে রায় ঘোষণা করার জন্য, অপরাধীরা তাদের শাস্তি পাবে না। এই ধারণা থেকেই তাৎক্ষণিক শাস্তি বা মব সন্ত্রাসের জন্ম হয়।
মব বিষয়ে আগেও আমরা অনেকবার কথা বলেছি। গুজবের মাধ্যমেও মব সংঘটিত হয়। গুজব এখন দ্রুত ছড়ায়, ডালপালা মেলে ধরতে থাকে। যেমন কেউ একজন বলল, ‘লোকটা চোর।’ এরপর অন্য কেউ বলল, ‘ও-ই তো মোবাইল ফোনটা চুরি করেছে।’ তৃতীয় একজন বলে বসল, ‘ও তো অমুক গ্যাংয়ের সদস্য।’ ব্যস, এরপর নিজের হাতে আইন তুলে নিতে মব সন্ত্রাস চলতে থাকে। বহু মানুষ যখন একজন মানুষকে মারতে থাকে, তখন ব্যক্তিগত বিবেক আর কাজ করে না। সবার সঙ্গে মিলে দুই ঘা বসিয়ে দেয় নিরীহ মানুষও। সঙ্গে এ কথাও সত্য, সমাজে চুরি, ছিনতাই, বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি, নিরাপত্তাহীনতা বেড়ে গেলে এই প্রবণতা বাড়ে।
কীভাবে তা কমানো যেতে পারে, সে ভাবনাটা এ মুহূর্তে খুবই জরুরি। কেউ কি শুনছে আমাদের এই কথা?