‘ওয়েম্যান’ শব্দটির অর্থ বেশির ভাগ মানুষ জানে না। আজকের পত্রিকায় আখাউড়া প্রতিনিধির পাঠানো একটি সংবাদ থেকে শব্দটি জানা গেল। ওয়েম্যান রেলওয়ে-সংশ্লিষ্ট একটি পদ। এই পদে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে রেললাইনের বিভিন্ন অংশের নাট-বল্টু, ফিশপ্লেট, ক্লিপসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ ঠিক রাখা এবং কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে দ্রুত তা মেরামত করা। আমরা যে ওয়েম্যানের কথা বলছি, তিনি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ঠিক রাখা ও ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত মেরামতের চেয়ে রেললাইনের নাট-বল্টু খুলে ভাঙারির দোকানে বিক্রি করার দিকে নজর দিয়েছিলেন। যে মালপত্র তিনি চুরি করেছেন, তার মূল্য হয়তো হাজার পাঁচেক টাকা। এভাবে মাসে যদি কয়েকবার চুরি করতে পারেন, তাহলে বেতনের ওপর উপরি লাভ কত হয়, সেটি দেখার বিষয়।
আমরা এই ঘটনাকে বলতে পারতাম, ‘রক্ষক যখন ভক্ষক’। কথাটা ভুল হতো না। কিন্তু তাতে প্রচলিত কথাটার দিকে নজর পড়ত আর ঘটনার গুরুত্ব কিছুটা খাটো হতে পারত। আমরা বলতে চাইছি, যিনি কোনো কাজের দায়িত্বে থাকেন, তখন যেসব জিনিস নিয়ে তাঁর কারবার, সেগুলোর প্রতি কি ভালোবাসা জন্মায় না? একটি নাট অথবা বল্টু সযত্নে যখন লাগান, তখন তিনি পুরো রেলওয়ে এবং যাত্রীদের কতটা উপকার করছেন, সেটা কি তিনি বোঝেন না? ছোট্ট একটি নাট অথবা বল্টু নড়বড়ে হয়ে গেলে কত মানুষ যে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে, তা কি তিনি বুঝতে পারেন না?
নিশ্চয়ই বোঝেন, কিন্তু আমাদের দেশে যে বিষয়টির ঘাটতি দিন দিন আরও বেশি দেখা যাচ্ছে, তা হলো জবাবদিহিহীনতা। অনেকের মনে পড়বে, ঢাকা শহরে চালানোর জন্য বিআরটিসি ভলভো বাস এনেছিল। কিছুদিনের মধ্যে সেগুলোর ওপর চলছিল নির্যাতন। বিআরটিসির কর্মচারীরা বাসগুলোকে চলার অনুপযোগী করে তুলেছিলেন। ‘সরকারি মাল দরিয়ায় ঢাল’ নিয়ে যে রসিকতা রয়েছে, তার যথার্থ ব্যবহার এই বিআরটিসি বাসগুলোর ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল। পরে সেগুলোর ঠাঁই হয়েছিল ভাঙারির দোকানে। আমাদের আখাউড়ার এই ওয়েম্যান একাই এক শ। তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্বকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি ভাঙারির দোকানে গেছেন বাড়তি টাকা কামাতে।
‘নৈতিকতা’ কি শুধু অভিধানে থাকা একটি স্থবির শব্দ হয়ে যাবে? ঘুষ-দুর্নীতির ঘটনা কাউকে অবাক করবে না? রাস্তাঘাটে হঠাৎ মব সৃষ্টিকারীরা যে কাউকে ধরে মারধর করতে থাকলে সবার মনে হবে, এটা স্বাভাবিক ঘটনা? দু-তিনজন বিভ্রান্ত মানুষ কারও সম্পর্কে বলে বসল, ‘লোকটা নিজেকে হত্যাযোগ্য করে তুলেছে।’ ব্যস, আর কোনো প্রমাণ বা বিচারের দরকার নেই। সেই মবই মেরে ফেলবে একজন মানুষকে, আর তা চেয়ে চেয়ে দেখবে মানুষ?
সমাজ থেকে ইতিমধ্যে যথেষ্ট দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। ওয়েম্যানের ‘নাট-বল্টুবিলাস’ সেই দুর্গন্ধের একটি নমুনা। তাঁর শাস্তি না হলে অন্য ওয়েম্যানরাও অচিরেই নিকটস্থ ভাঙারির দোকান চিনে নেবেন—এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।