হোম > মতামত > সম্পাদকীয়

বিদ্যুৎ সংকট

সম্পাদকীয়

বর্তমানে দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ফলে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্যাসের চুলা দিনের বেশির ভাগ সময় জ্বলছে না। অপরদিকে রাজধানীসহ সারা দেশে লোডশেডিং বেড়েছে। শহরের চেয়ে গ্রামে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ বেশি। গ্রামে ১০-১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং চলছে।

দেশের জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং আমদানিনির্ভরতা মূলত এর জন্য দায়ী। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বারবার এসব কথা বললেও কোনো সরকার বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। ফলে দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। তবে কয়েক দিনে বিদ্যুতের সমস্যা এত জটিল আকার ধারণ করেছে, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উপকেন্দ্রগুলোতে হামলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা জোরদারের আবেদন করা হয়েছে। পরিস্থিতি কত ভয়াবহ হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার আশঙ্কা তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে সাময়িক তালি দেওয়া সমাধানের পথ থেকে বেরিয়ে এসে সরকারের উচিত দ্রুত ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে সরকারের প্রধান করণীয় হতে পারে জ্বালানি খাতকে আমদানিনির্ভরতা থেকে বের করে নিয়ে এসে দেশীয় গ্যাস সম্পদ অনুসন্ধানে মনোযোগ দেওয়া।

বিগত সরকারের সময় দেশের নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধানে মনোযোগ দেওয়া হয়নি; বরং ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির দিকে অতিমাত্রায় আগ্রহ দেখা গেছে। ফলে এর মাশুল দেশবাসীকে দিতে হচ্ছে। সাগরে সামান্য লঘুচাপ সৃষ্টি হলে সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়া কোনো টেকসই জ্বালানিকাঠামোর লক্ষণ হতে পারে না। ফলে গভীর ও অগভীর সমুদ্রে এবং স্থলভাগে দ্রুত নতুন গ্যাসকূপ খনন ও অনুসন্ধানের কাজ ত্বরান্বিত করা জরুরি। পাশাপাশি রূপান্তর ও সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে বৈরী আবহাওয়ায় বিকল্প উপায়ে ভাসমান টার্মিনাল থেকে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ সচল রাখা সম্ভব হয়।

শহর ও গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহে আগের মতো এখনো চরম বৈষম্য বিরাজমান। ফলে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি, বিশেষ করে কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্পে ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ জন্য গ্রামীণ গ্রাহকদেরও শহরের মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনে দ্রুত নবায়নযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প; যেমন সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুতের প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। স্বল্প মেয়াদে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের জন্য আপৎকালীন জ্বালানির মজুত গড়ে তোলার দিকেও মনোযোগ দিতে হবে, যেন জরুরি অবস্থায় অন্তত কয়েক সপ্তাহের চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়।

বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিরাপত্তা বাড়িয়ে বা পুলিশ মোতায়েন করে জনগণের ক্ষোভকে দীর্ঘ মেয়াদে প্রশমিত করা সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোর সুরক্ষা অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তার চেয়েও বেশি জরুরি গ্রাহকের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া। প্রতিমন্ত্রী যে আশ্বাসের কথা বলছেন, তা যেন বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে।

বাস্তব পদক্ষেপে তার প্রতিফলন দেখতে চায় দেশের মানুষ। জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট সংস্কারের পাশাপাশি বর্তমান দুর্যোগ সামাল দিতে তাৎক্ষণিক ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সরকারের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।