হোম > মতামত > সম্পাদকীয়

শিশুর পুষ্টিহীনতা

সম্পাদকীয়

আমরা অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদনে অনেকটা সফলতা অর্জন করেছি। কিন্তু এসব ভালো দিকের সমান্তরালে এক ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে ২০২৫ সালের ‘মাল্টিপল ইনডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে’ (এমআইসিএস)। সেই জরিপ পরিচালিত হয়েছে ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) যৌথ উদ্যোগে। সেই জরিপ মতে, দেশে ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুর মধ্যে ৭০ শতাংশই ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য খাদ্য পাচ্ছে না। স্বাধীনতা অর্জনের পাঁচ দশকের বেশি সময় পরেও এমন পরিসংখ্যান মেনে নেওয়ার মতো নয়, বরং এ বাস্তবতা জাতির ভবিষ্যৎ জাতি গঠনের দুর্বলতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মের পর প্রথম দুই বছর শিশুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেলে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি যেমন ব্যাহত হয়, তেমনি তার মস্তিষ্কের বিকাশ এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জরিপের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ২৪ শতাংশ শিশু খর্বাকৃতির। এই বিশাল জনগোষ্ঠী যদি শৈশব থেকেই অপুষ্টির শিকার হয়, তবে ভবিষ্যতে একটি দক্ষ ও মেধাবী জাতি হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যাবে। অপুষ্টির এই সংকটের পেছনে কেবল দারিদ্র্য বা খাদ্যের অভাবই একমাত্র কারণ নয়। বরং এখানে সচেতনতার অভাব ও শিশুখাদ্য নিয়ে অজ্ঞতা বড় কারণ।

জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে নবজাতককে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো জরুরি হলেও এবং সরকারি প্রচার-প্রচারণা সত্ত্বেও এই হার মাত্র ৩০ শতাংশ।

ধনী পরিবারগুলোর মধ্যে মাত্র ৪৭ শতাংশ শিশু পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য খেতে পারে। এ থেকে বোঝা যায়, শুধু সামর্থ্য থাকলেই শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত হয় না, সঠিক পুষ্টিজ্ঞান জানা থাকাটাও জরুরি। তবে অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে কয়েক বছর ধরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে মূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির কারণে দরিদ্র, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুরা প্রয়োজনের তুলনায় পুষ্টিকর খাবার খেতে পারছে না।

দেশে পুষ্টি কার্যক্রমের সঙ্গে অন্তত ২৫টি মন্ত্রণালয় যুক্ত আছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন কেন দেখা যায় না, সে প্রশ্ন তোলা জরুরি। মূলত মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং দুর্বল পরিকল্পনাই এই স্থবিরতার মূল কারণ। সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থ ব্যয় হলেও শিশুরা কেন পুষ্টিকর খাবার পায় না, তার দায় এই মন্ত্রণালয়গুলো এড়াতে পারে না।

২০১৫ সালে জাতীয় পুষ্টিনীতি করা হয়েছিল। এটা বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদকে (বিএনএনসি) আরও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে ২৫টি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়। দেশের শিশুদের পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার পাশাপাশি অত্যাবশ্যকীয় পুষ্টিকর পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে হবে।

আমরা আশা করব, সরকার এই জরিপের ফলাফলকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করে, তা সমাধানে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।