এ এক আজব ঘটনা। একজন প্রধান শিক্ষক স্কুলে থাকা বই পুড়িয়ে ফেলতে পারেন, এ ঘটনা কবে কোথাও দেখা গেছে কি না, তা আমাদের জানা নেই। ইতিহাস বলে, দূর অতীতে দুর্বৃত্তের দল যখন কোনো দেশে আক্রমণ করত, তখন সেই দেশের শিল্প-সংস্কৃতি-শিক্ষা নষ্ট করে ফেলার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আগুন দিত। এভাবে সভ্যতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারা তৃপ্তি পেত। বরগুনার আমতলীর এমইউ বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কি সেই ধরনের কোনো শিক্ষা নিয়েছিলেন? নইলে কী করে তিনি স্কুলের বই এবং বিভিন্ন আসবাব পুড়িয়ে ফেলতে পারেন? আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে যদিও বলা হচ্ছে, এই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে বই ও আসবাব পুড়িয়ে ফেলার অভিযোগ আছে, কিন্তু স্বয়ং প্রধান শিক্ষকই বলেছেন, ‘উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু পুরোনো বই ও আসবাব পুড়িয়ে ফেলেছি, কোনো নতুন বই পোড়ানো হয়নি।’ অর্থাৎ, অভিযোগ নয় শুধু, কাণ্ডটা তিনি ঘটিয়েছেন বলে নিজে স্বীকারও করে নিয়েছেন।
প্রধান শিক্ষকের দিকে যে সন্দেহের তির ছুটে গেছে, সেটিও অর্ধকোটি টাকার দুর্নীতি-সংক্রান্ত। এই টাকা নাকি তিনি আত্মসাৎ করেছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, দুর্নীতির আলামত নষ্ট করার জন্যই প্রধান শিক্ষক এই কাণ্ড ঘটিয়েছেন। বই পোড়ানো বিষয়ে তিনি প্রশাসন বা ব্যবস্থাপনা কমিটির কারও সঙ্গে আলোচনা করে নেননি।
তদন্ত নিশ্চয় হবে এ বিষয়ে। এর মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসবে থলের বিড়াল। সেটা দেখার অপেক্ষায় রইলাম আমরা। তবে, যে প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা চলতেই থাকবে, তা হলো কোনো বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক একদা তাঁরই স্কুলে থাকা বই পুড়িয়েছিলেন! এ রকম ঘটনা সচরাচর ঘটে না। শিক্ষার্থীদের যিনি বইয়ের প্রতি ভালোবাসার শিক্ষা দেবেন, তিনি তা না করে বই পুড়িয়েছিলেন—এ রকম ভয়ংকর ঘটনা এই স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য কী বার্তা দেবে? শুধু এই স্কুলের কেন, গোটা দেশের স্কুলশিক্ষার্থীরা তাঁর কাছ থেকে কী বার্তা পাবে? নিজের ওপর থেকে দুর্নীতির অভিযোগ ঝেড়ে ফেলতে হলে তিনি সততার সঙ্গে আইনি পথ খুঁজে নিতে পারতেন। দোষী না হলে সসম্মানে অভিযোগ থেকে মুক্ত হতেন। কিন্তু তিনি সেই পথ মাড়ালেন না। বই আর আসবাবে আগুন দিলেন! দুপুরবেলায় যখন তিনি ২০ বছরের নতুন-পুরোনো আসবাব পোড়াচ্ছিলেন, তখন বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। এই ধোঁয়া শিক্ষার্থীদের মগজকেও ধোঁয়াচ্ছন্ন করে তুললে তার দায় কে নেবে?
বই এবং আসবাব পোড়ানোর যে ছবিটি আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, তা দেখে যে কেউ মর্মাহত হবে। শিক্ষকদের মধ্যে এই বই পোড়ানোর প্রবণতা যেন ছড়িয়ে না পড়ে, সেটা নিশ্চিত করার জন্য বিষয়টির তদন্ত হওয়া খুব জরুরি। শিক্ষকদের সম্মান করে শিক্ষার্থীরা। সবাই জানে, তাঁদের মানুষ গড়ার কারিগর নামে অভিহিত করা হয়। তাঁদের মধ্যে সততা, নৈতিকতা, সহনশীলতা, প্রজ্ঞাই দেখতে চায় সমাজ। শিশুর মনস্তত্ত্ব বিকাশে শিক্ষকই তো প্রধান সহায়ক। সেই কথা শিক্ষকদের মনে রাখা প্রয়োজন।