হোম > মতামত > সম্পাদকীয়

প্রেমের নাটক

সম্পাদকীয়

গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বিগত দুই বছরে এত বৈচিত্র্যময় ঘটনা ঘটছে যে মাঝে মাঝে শঙ্কা হয়, দেশটা পা পিছলে আলুর দম হবে না তো? এই উদ্ভট কর্মকাণ্ডের এখন পর্যন্ত সর্বশেষ সংযোজন হলো একজন আইনজীবীর আইনি নোটিশ। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও বিভাগে সেই আইনজীবী যে আইনি নোটিশটি পাঠিয়েছেন, তাতে বলা হয়েছে প্রেমের নাটক-সিনেমা বানানো যাবে না, দেখানো যাবে না। দেখালে নাকি সমাজে অবক্ষয় আসবে!

সমাজে অবক্ষয় আসার জন্য নাটক-সিনেমায় দেখানো প্রেমকেই দায়ী করলেন একজন আইনজীবী! ভুক্তভোগীরা জানে, বিভিন্ন মহলের মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতির গলা টিপে ধরার মতো ঘটনা একের পর এক ঘটানো হচ্ছে। এই ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অধ্যাপক ইউনূস তাঁর শাসনকালে মবতন্ত্রকে একরকম বৈধতা দিয়েছিলেন, যা কিছু সুন্দর, যা কিছু সমাজের বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে, তার বিরুদ্ধে যারা হামলা চালিয়েছে, তাদের ব্যাপারে আইনি পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। ফলে এই অপশক্তি আরও শক্তিশালী হয়ে পড়েছে। দেশের সংস্কৃতি নিয়ে নির্বাচিত সরকারের ভাবনা কী, সেটা স্পষ্ট করে না বললে ভাবনার রাজ্যকে ওলট-পালট করে দেওয়ার এই অপতৎপরতা চলতেই থাকবে।

নাচ-গান-নাটক-সিনেমাসহ সংস্কৃতির নানা উপাদানকে যেভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে, তাতে সৃজনশীলতা কি এ দেশে অপরাধ বলে গণ্য হবে? ‘তৌহিদি জনতা’ নাম ধারণ করে যেকোনো অপশক্তি সংস্কৃতির ওপর ঝাঁপাঝাঁপি করলে তাতে রাষ্ট্রের কতটা উপকার হয়, সেটা নিয়ে কি সরকার ভাববে না? বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি অসাম্প্রদায়িক হবে—এই অঙ্গীকারের কথা কে না জানে? কিন্তু বারবার সেই প্রতিশ্রুতির ওপর কালিমা লেপন করে যাচ্ছে এই অপশক্তি। এ ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকার কোনো সুযোগ নেই সরকারের। সরকার যদি এদের ব্যাপারে শক্ত অবস্থান নিত, তাহলে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল সংকুচিত হয়ে উঠত না।

সংস্কৃতির নামে স্থূলতার প্রকাশ যেকোনো সংস্কৃতির জন্যই ক্ষতিকারক। খারাপ কিছুকে ভালোর পোশাক পরিয়ে ভালো করা যায় না। রুচিশীল উৎকৃষ্ট মানের সৃজনশীলতাই সেই স্থূলতাকে দূর করতে পারে। যেকোনো সংস্কৃতিমান মানুষ সেদিকেই নিজেকে পরিচালিত করে। কিন্তু প্রেমকে উপজীব্য করে নাটক-সিনেমা তৈরি করা যাবে না বলে যারা সোচ্চার হয়, তারা মূলত বিশ্ব ইতিহাসও জানে না, বিশ্ব সংস্কৃতিও বোঝে না। সৃষ্টির আদিকাল থেকেই সংস্কৃতি বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কৃতির একটি বড় উপজীব্য প্রেম। পৃথিবীর সব সংস্কৃতিতেই প্রেমের সৃজনশীল প্রকাশ দেখা যায়। সেই প্রেমকে নাকচ করার প্রস্তাব ধৃষ্টতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

ক্ষমা করুন দান্তে, ক্ষমা করুন শেক্‌সপিয়ার, ক্ষমা করুন রবীন্দ্রনাথ, ক্ষমা করুন ফেরদৌসী। আপনাদের অপূর্ব সাহিত্যরসে ডুবে মানুষ প্রেমের যে মাহাত্ম্য খুঁজে পায়, তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। শিক্ষা, সংস্কৃতির কণ্ঠরোধ করতে চায় যারা, তাদের হটিয়ে দিতে না পারলে রোমিও-জুলিয়েট, শিরি-ফরহাদেরা বিপদে পড়বে। রোমান্টিক প্রেমের মৃত্যু ঘটুক অসংস্কৃত তরবারির আঘাতে, সেটা কোনো সুস্থ বুদ্ধির মানুষ চাইতে পারে না। তাই প্রতিরোধ এখন সময়ের দাবি।