২৫ মার্চ বিকেলে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাটে একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। পন্টুন থেকে সৌহার্দ্য পরিবহন নামের একটি যাত্রীবাহী বাস পদ্মার উত্তাল স্রোতে তলিয়ে গেছে। নিখোঁজ থাকা অনেক মানুষকে এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। অল্প কিছু মানুষ সাঁতরে জীবন বাঁচাতে পেরেছেন।
প্রশ্ন হলো, এসব অকালমৃত্যু দুর্ঘটনা নাকি কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড? প্রতিবছর নানাভাবে অসংখ্য মানুষের প্রাণ ঝরছে, কিন্তু এর প্রতিকারের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা সরকারের পক্ষ থেকে গ্রহণ করতে দেখা যায় না। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর রুটিন অনুসারে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেসব তদন্ত কমিটির রিপোর্ট অপ্রকাশিত থেকে যায়। আর প্রকাশিত হলেও তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন হয় না। দুর্ঘটনার কারণে জীবন ও সম্পদহানির জন্য কোনো ক্ষতিপূরণও দিতে দেখা যায় না। এসবের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো দায়দায়িত্ব গ্রহণের ব্যাপার চোখে পড়ে না। ফলে একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার এবং আরও ভয়ংকরভাবে ঘটতে থাকে।
দেশের ব্যস্ততম এই ঘাটে এ ধরনের দুর্ঘটনা নতুন নয়। অথচ বারবার একই স্থানে দুর্ঘটনা ঘটা সত্ত্বেও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন বা সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায়, অধিকাংশ ফেরিঘাটের পন্টুন এবং সংযোগকারী সড়কগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বর্ষার সময় এগুলো পিচ্ছিল হয়ে পড়ায় যানবাহন ও লোকজন স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে না।
এই দুর্ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে সেখানে শক্তিশালী সুরক্ষা বেষ্টনী না থাকার কারণে ঘটনাটি ভয়াবহভাবে ঘটতে পেরেছে। গাড়ি ফেরিতে ওঠার আগে যদি যাত্রীদের নামানো যেত, তাহলে অনেক প্রাণ বেঁচে যেত।
একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষের সময়েও বাসটি উদ্ধার করতে ছয় ঘণ্টা সময় লেগে যাওয়া আমাদের সক্ষমতার অভাবকেই নির্দেশ করছে। ফেরিঘাটে কেন স্থায়ী উদ্ধারকারী ডুবুরি বাহিনী থাকবে না। ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধারকারী বাহিনী কাজ করলে আরও অনেক মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো।
এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঠেকাতে প্রয়োজন দেশের প্রতিটি ফেরিঘাটের পন্টুনগুলোকে আধুনিক ও টেকসই করা। পন্টুন ও র্যাম্পের দুই পাশে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন নিরাপত্তাবেষ্টনী নির্মাণ করা, যাতে কোনো যান নিয়ন্ত্রণ হারালেও সরাসরি নদীতে পড়ে না যায়। একই সঙ্গে শুধু বাসের ফিটনেস নয়, যে ফেরি এবং পন্টুন ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলোর কারিগরি ফিটনেস নিয়মিত পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটে ২৪ ঘণ্টা ফায়ার সার্ভিস, ডুবুরি দলের উপস্থিতি, অত্যাধুনিক ক্রেন এবং উদ্ধারকারী নৌযান প্রস্তুত রাখতে হবে।
এ ধরনের দুর্ঘটনার পর কেবল চালককে দোষারোপ না করে সংশ্লিষ্ট ঘাটের ইজারাদার এবং বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কাঠামোগত ত্রুটি থাকলে তার দায় কর্তৃপক্ষ ও রাষ্ট্রকেই গ্রহণ করতে হবে।
দৌলতদিয়ায় পদ্মা নদীতে তলিয়ে যাওয়া বাসটি আসলে আমাদের অব্যবস্থাপনার চিত্র স্পষ্ট করেছে। এ জন্য দেশের প্রতিটি ফেরিঘাটে কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।