বরগুনার স্কুল ফিডিং প্রকল্পে কাঁচা কলা, পচা ডিম আর ফাঙ্গাস পড়া রুটি সরবরাহের খবরটি পড়ে মনে হলো, মুনাফার জন্য লালায়িত মানুষের হাতে সরকারি যেকোনো ভালো উদ্যোগই অসফল হতে পারে। আমাদের আমতলী (বরগুনা) প্রতিনিধি এ বিষয়ে যে খবরটি পাঠিয়েছেন, তা খুবই দুঃখজনক। শিশুদের জন্য যারা পচা ডিম, কাঁচা কলা সরবরাহ করতে পারেন, এই কাজে তাঁদের যুক্ত থাকার কোনো অধিকার আছে কি না, সে প্রশ্নটিও তো করতে হয়।
উদ্যোগটি ভালো। উপকূলীয় অঞ্চলের শিশুশিক্ষার্থীরা যেন শিক্ষায় মনোনিবেশ করতে পারে এবং তাদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হয়, সেই বিবেচনা থেকেই স্কুল ফিডিং প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আমাদের দেশের একটি পশ্চাৎপদ এলাকার শিশুরা পুষ্টিকর খাবার পাবে—এ তো আনন্দ সংবাদ। কিন্তু এ ধরনের ভালো উদ্যোগগুলো কেন এ রকম খারাপ মানুষের হাতে যায়, সেটাই প্রশ্ন। তালতলী উপজেলার ৭৯টি স্কুলের ৭ হাজার ২৭০ শিশুকে এই প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে। অর্থাৎ যেদিন স্কুল খোলা থাকবে, সেদিন প্রতিটি শিশু ডিম, রুটি, কলা, বিস্কুট ও দুধ পাবে। পুষ্টিস্বল্পতায় ভোগা শিশুর জন্য এ এক বিশাল প্রাপ্তি। ব্যাপারটিকে দেখা উচিত জনকল্যাণের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। কিন্তু যাঁরা সরবরাহের দায়িত্ব পাচ্ছেন, তাঁরা যে বিষয়টিকে নিছক মুনাফা লাভের উপায় হিসেবে দেখছেন, সে বিষয়ে কি কোনো সন্দেহ আছে?
আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত খবরটিতে দেখা যাচ্ছে শিশুরাই বলছে, ‘ডিম ও রুটি পচা। খাওয়ার উপযোগী না। তাই ফেলে দিয়েছি।’ প্রশ্ন হলো, যাঁরা স্কুলগুলোয় খাবার সরবরাহের দায়িত্ব নিয়েছেন, তাঁরা কি একটু যাচাই করে কেনাকাটার কাজটি করবেন না? তাজা ডিমের কি আকাল পড়েছে দেশে? কিংবা আমাদের দেশের কলাগুলো কি আর পাকে না? আমাদের দেশের রুটিগুলোয় কি অবিরত ফাঙ্গাস পড়ে? যাঁরা স্কুলগুলোয় খাবার সরবরাহ করছেন, তাঁরা কি নিজের বাড়িতে এ রকম একই খাবার সরবরাহ করতে পারবেন? নিজের সন্তানদের হাতে তুলে দিতে পারবেন পচা ডিম? কাঁচা কলা তাদের হাতে তুলে দিয়ে বলতে পারবেন—‘কাঁচা কলাতেই পুষ্টি আছে, খেয়ে নে?’
লোভ যদি সেবার অভিপ্রায়কে গ্রাস করে ফেলে, তাহলে তা আর সেবা থাকে না। উপকূলীয় শিশুদের জন্য ভালো কিছু করার জন্য সরকার যে টাকা বরাদ্দ দেয়, তা তখন পরিহাসে পরিণত হয়। শুধু কি পরিহাস?
তা তো ট্র্যাজেডিরও রূপ নেয়। নইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প পরিচালক কীভাবে বলেন, ‘ডিম তো কেউ নিজে থেকে পেড়ে দেয় না!’ এত অপমানজনক কথা তিনি কী করে বলতে পারলেন? কোথায় পচা ডিম সরবরাহের জন্য তিনি ক্ষমা চাইবেন, তা না করে বরং অপমান করছেন শিশুদের। স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করে পচা ডিম সরবরাহ করলে যে তার জন্য জবাবদিহি করতে হয়, সে কথা তিনি কি বুঝবেন?
এই প্রতিষ্ঠানকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো খুবই জরুরি।