হোম > মতামত > সম্পাদকীয়

গোয়ালঘর

সম্পাদকীয়

বরগুনার মানুষ আনন্দে হাসবে নাকি দুঃখে কাঁদবে, তা ঠিক করার ভার তাদেরই দেওয়া উচিত। অথবা হাসি-কান্না বাদ দিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে থাকাটা নিরাপদ কি না, সেটাও তারা ভেবে দেখতে পারে। আচ্ছা, ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’ শব্দটি কি এখনো বাংলা ভাষায় আছে? শব্দটি কি স্কুল-কলেজে পড়ালেখার সময় আর ব্যবহৃত হয়? নাকি তা নিত্যদিনের ব্যবহারে ঠাঁই না পেয়ে অভিধানের শব্দ হিসেবে, কথোপকথনের ভাষা হিসেবে আর নিজেকে জীবিত রাখতে পারেনি? ওই যে, অতীতে পড়ানো হতো, কিম‍+কর্তব্য‍+বিমূঢ়। তারপর বলা হতো, কিম মানে হলো কী, কর্তব্য হলো করণীয় কাজ আর বিমূঢ় মানে হলো হতবুদ্ধি বা বিভ্রান্ত হয়ে যাওয়া। বরগুনার মানুষ টাউন হল চেয়ে যখন গোয়ালঘর পেল, তখন তারা হতবুদ্ধি হবে না তো কী হবে?

কথাটা একটু খোলাসা করে বলা দরকার। আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক জগৎটাকে যেখানে নামিয়েছি, তারই একটা নমুনা দেখা যাবে বরগুনার এই গোয়ালঘরটির কেচ্ছা শুনলে। এত ধরনের মববাজি, হাঙ্গামা পার হয়েও বরগুনায় এখনো সক্রিয় আছে গোটা বিশেক সাংস্কৃতিক সংগঠন। এই সংগঠনগুলো বহুদিন ধরে একটি পৌর মিলনায়তন ভবন নির্মাণের জন্য বলে আসছিল। সেই দাবি অনুযায়ী শহরের সিরাজউদ্দীন সড়কে প্রায় ৫০০ আসনের একটি ভবন নির্মাণও করা হয়েছে। মানে খোলসটা নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু কাজ পুরোপুরি শেষ করার আগেই ঠিকাদারের আর পাত্তা নেই। নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালের মার্চ মাসে। ২০২২ সালে এই মিলনায়তন নির্মাণের ৮০ শতাংশ শেষ করে লাপাত্তা হয়ে যায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এভাবে পড়ে থাকতে থাকতে এই ভবনকে নিয়ে আর কী হতে পারে, তা চটজলদি ভেবে দিয়েছে স্থানীয় তস্কর সম্প্রদায়। তারা ভবনের দরজা-জানালাসহ বিভিন্ন অংশ খুলে নিয়ে যাচ্ছে। এতেও মন ভরেনি অনেকের। শেষ না হওয়া টাউন হলটিকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে ভাবতে ভাবতে কেউ কেউ এটিকে গরু-ছাগল রাখার গোয়ালঘর হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করেছে। স্থানীয় মাদকসেবীরাই বা পিছিয়ে থাকবে কেন, তারাও এখানে এসে তাদের জৌলুশ দেখিয়ে যাচ্ছে!

অথচ সদিচ্ছা থাকলে স্থানীয় মানুষ এই এলাকায় সংস্কৃতির উৎকর্ষ ঘটাতে পারত। তাদের জন্য একটি ছিমছাম গোছানো টাউন হল উপহার দিলে এলাকায় নাটক, সংগীত, কবিতাসহ নানা ধরনের অনুষ্ঠান হতে পারত। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এসে এলাকাবাসী তাদের রুচির চর্চা করতে পারত। কিন্তু তা আর হলো না। টাউন হল না হয়ে তা হয়ে গেল গোয়ালঘর আর মাদকসেবীদের আড্ডাখানা!

কার দোষে কী হয়েছে, সেটা নিয়ে কথা চালাচালি চলুক। কিন্তু মূল কাজটা হোক টাউন হলের কাজটি শেষ করাকে ঘিরে। স্থানীয় মানুষ তাদের সাংস্কৃতিক জীবনের কথাকে মূল্য দিয়ে সোচ্চার হয়ে উঠুক। সেই হারিয়ে যাওয়া ঠিকাদারকে খুঁজে বের করে বলা হোক—এই ফসিল থেকে জীবিত সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি করা হোক।

কিংকর্তব্যবিমূঢ় বরগুনাবাসী এবার জ্বলে উঠুক। যদি জ্বলে ওঠে, তবে দেশে বন্ধ হয়ে যাওয়া সিনেমা হল, কনসার্ট ইত্যাদির প্রতি অঙ্গীকারগুলোও ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তা অবদান রাখবে।