হোম > মতামত > সম্পাদকীয়

সিলেবাস থিয়েটার

সম্পাদকীয়

স্বাধীনতার এত বছর পরেও আমরা একটা যথাযথ শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে পারিনি। এ নিয়ে শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের আক্ষেপের শেষ নেই। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে, তখন সেই দলের চিন্তাভাবনা তারা শিক্ষানীতিতে প্রয়োগ করে থাকে। ফলে শিক্ষার্থীরা বিশেষ করে দেশের ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে। বলতে হয়, শিক্ষা এখন সংবিধানের মতো কাটা-ছেঁড়ার বিষয়ই রয়ে গেছে। অপরদিকে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বড় গলদ হলো, স্কুলের শিশুরা আনন্দের মাধ্যমে পাঠ নিতে পারে না। ফলে স্কুল তাদের কাছে একধরনের আতঙ্কের নাম।

শিক্ষা নিয়ে এত নেতিবাচকতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক শুকুরিয়া পারভীন এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। সম্প্রতি পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার সীমান্তঘেঁষা প্রত্যন্ত গ্রামে অবস্থিত শারিয়াল জাত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনি ‘সিলেবাস থিয়েটার’ নামের এক ব্যতিক্রমী কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন। এর মাধ্যমে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের গল্প-কবিতাকে নাট্যরূপ দেওয়া হচ্ছে। আর সেই নাটকের বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করছে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই। ছয় দিন ধরে তাদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে মেডিটেশন, যোগব্যায়াম, শরীরচর্চা, শুদ্ধ উচ্চারণ, আবৃত্তি, উপস্থিত বক্তৃতা এবং ভাষাচর্চার নানামুখী অনুশীলন। পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে উপজেলার ১০টি বিদ্যালয়ে এ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। ফলে শিশুরা আনন্দের সঙ্গে শিক্ষা নিতে পারবে এবং তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে।

এ ঘটনা আমাদের চিরাচরিত পাঠদান পদ্ধতির খোলনলচে বদলে দেবে নিশ্চিতভাবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ, সৃজনশীলতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এ ধরনের উদ্যোগের প্রশংসা না করে উপায় নেই। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, এমন ভালো উদ্যোগ যেন প্রশাসনিক নানা জটিলতায় বন্ধ হয়ে না যায়। আর উদ্যোগটি দেশের সব স্কুলে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন উদ্যোগ-পরিকল্পনা নিতে পারে। এ জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) মাধ্যমে পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তুকে কীভাবে নাট্যরূপে রূপান্তর করা যায়, তার একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও সহায়িকা তৈরি করতে হবে। বিদ্যমান পাঠ্যক্রমের প্রতিটি শ্রেণির কিছু বিষয়ের অধ্যায়ভিত্তিক কিছু অংশকে ছোট ছোট নাট্যাংশে রূপ দিলে যেকোনো প্রান্তের শিক্ষকেরা সহজেই শ্রেণিকক্ষে থিয়েটারভিত্তিক পাঠদান পরিচালনা করতে পারবেন।

এর জন্য জরুরি হলো শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। এ ছাড়া জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে উপজেলা পর্যায়ে বাৎসরিক নাট্যোৎসব ও প্রতিযোগিতার আয়োজন করা গেলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়বে। ফলে তাদের মধ্যে আরও ভালো করার মানসিকতা তৈরি হবে।

পঞ্চগড়ের এ ঘটনা প্রমাণ করেছে, এটা একটা দৃষ্টান্তমূলক উদ্যোগ। বর্তমান আধুনিক যুগে শিশুদের আত্মপ্রকাশের ক্ষমতা, শুদ্ধ ভাষা উচ্চারণ, শারীরিক-মানসিক সক্ষমতা এবং দলের সঙ্গে মিলে কাজ করার দক্ষতা অর্জন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ উদ্যোগ দেশের প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কার্যকর করা গেলে শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন ধারা তৈরি হবে।