সংবাদপত্রে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদন পড়লে মন খারাপ হয়ে যায়; যেমন ২৯ জুলাই আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন। যা পড়ে কারও মনে হতে পারে—কেউ কেউ পৃথিবীতে আসেন আনন্দে বাঁচতে, কিন্তু বেঁচেও যেন মৃতপ্রায়। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার দিনমজুর মন্টু মিয়ার অবস্থা এমনই শোচনীয়।
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সংসারের অনটন মেটাতে স্থানীয় একাধিক এনজিও এবং মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলেন তিনি। দিন আনে দিন খাওয়া মন্টুর পক্ষে সময়মতো কিস্তির টাকা শোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই বাধ্য হয়ে দালাল চক্রের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা পাওয়ার আশ্বাসে নিজের একটা কিডনি বিক্রি করতে রাজি হন। গত জানুয়ারি মাসের শুরুতে দালালেরা অগ্রিম ৫০ হাজার টাকা দিয়ে প্রথমে ভারতে এবং পরে নেপালের একটি হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর শরীর থেকে একটি কিডনি বের করে নেন। দেশে ফিরে যখন তাঁদের কাছ থেকে বাকি টাকা চান, তখন দালালেরা সরে পড়েন।
এরপর মন্টু বুঝতে পারেন যে তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কাছে ধরনা দিয়েও কোনো লাভ হয়নি। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা উল্টো টাকা লেনদেনের বিষয়টি অস্বীকার করে তাঁকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাতে থাকেন।
মন্টু মিয়া এখন কিডনি হারিয়ে শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়েছেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি কর্মক্ষমতা হারিয়ে বিছানায় পড়ে থাকায় পুরো পরিবার চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে। দালালদের বিরুদ্ধে মামলা করার পর ঘটনাটি জনসমক্ষে এসেছে।
আমাদের দেশে নানা শ্রেণির দালাল রয়েছে। তাদের দৌরাত্ম্য থামাতে জনগণকে সচেতন হতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। বিভিন্ন মিডিয়ার ভূমিকাও আছে। এ ছাড়া এ ধরনের অপরাধীদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু আদালতের নির্দেশে মামলা করা বা তদন্তের আশ্বাসে দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক স্থানীয় দালাল, ভুয়া নথি ও পাসপোর্ট তৈরিতে সহায়তাকারী এবং সীমান্ত পারাপারে সাহায্যকারী অসাধু চক্রকে চিহ্নিত করে দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনতে হবে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের অমানবিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
শুধু আইনি পদক্ষেপে এই সংকট থেকে সম্পূর্ণ উত্তরণ সম্ভব নয়। এর গভীরে রয়েছে গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের চরম আর্থিক অনটন ও অনিয়ন্ত্রিত ঋণব্যবস্থা। এনজিও এবং মহাজনদের চড়া সুদের ঋণ এবং তা আদায়ে অনৈতিক চাপ অনেক সময় সাধারণ মানুষকে এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়। ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী সংস্থাগুলোর ঋণ আদায়ে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থিক সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
এই মুহূর্তে জরুরি বিনা মূল্যে মন্টু মিয়ার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন এবং সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের এগিয়ে আসা দরকার।