হোম > মতামত > সম্পাদকীয়

ঘোড়া জবাই

সম্পাদকীয়

গাধার মতো পরিশ্রম করেও কোনো লাভ হলো না তাঁদের। এত কষ্ট করে ঘোড়া জবাই দিয়ে এর মাংস রাজধানীর বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু বিধি বাম! পুলিশের তর সইল না। বিতরণের আগেই তাঁদের আটক করে ফেলা হলো। আর ঢাকার ভোজনরসিকেরাও ঘোড়ার মাংস চেখে দেখা থেকে বঞ্চিত হলেন। কী একটা অবস্থা!

যাঁদের কথা বলা হচ্ছে তাঁরা হলেন মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার পূর্ব দাশড়া এলাকার মিজানুর রহমান, গাজীপুরের তেলিপাড়া এলাকার রুবেল ও দিঘিরচালা এলাকার ইব্রাহিম খলিল, জামালপুরের তুলসীপুর এলাকার সোহেল রানা, টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী এলাকার হুমায়ুন কবির এবং ঢাকার মারুফ, ইমন হাসান, মাসুদ ও তুহিন। তাঁরা মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার জাগীর এলাকায় পরিত্যক্ত একটি কারখানার গোডাউনে গোপনে ১৩টি ঘোড়া জবাই করে মাংস প্রক্রিয়াজাত করছিলেন। ২২ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে পুলিশ তাঁদের এই প্রস্তুতিতে পানি ঢেলে দেয়! পরদিন ভ্ৰাম্যমাণ আদালত তাঁদের একজনকে এক বছর এবং অপর আটজনকে ছয় মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন।

পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১১-এর ৪ ধারা লঙ্ঘনের কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এই ধারা অনুযায়ী সরকার চাইলে যেকোনো সুনির্দিষ্ট পশুকে জবাইয়ের তালিকা থেকে নিষিদ্ধ করতে পারে। ঘোড়া বা এই জাতীয় প্রাণী বাংলাদেশে প্রচলিত বাণিজ্যিক মাংসের উৎস হিসেবে আইনের বিধিমালায় অনুমোদিত নয়। আবার জালিয়াতি করে গরুর মাংসের সঙ্গে মিশিয়ে কিংবা গরুর মাংস বলেই ঘোড়ার মাংস বিক্রি করা নিশ্চয়ই দণ্ডনীয় অপরাধ।

মানুষের খাদ্যতালিকায় কোন মাংস যাবে, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন—সেই মাংস কোথা থেকে আসছে, কীভাবে প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে এবং ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগে তার মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে কি না। মানিকগঞ্জের এই ঘটনায় এইসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়া যায়নি বলেই অপরাধীদের দণ্ড দেওয়া হয়েছে। খুবই প্রশংসনীয় কাজ। তবে ঘটনাটি এ-ও সতর্ক করে দেয় যে জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, আইন প্রয়োগ এবং বাজার তদারকির মতো বিষয়গুলোকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভোক্তার সচেতনতার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় তদারকি অত্যন্ত জরুরি। রেস্তোরাঁগুলোতে ব্যবহৃত মাংসের উৎস, সরবরাহকারী এবং সংরক্ষণব্যবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করা দরকার। অনুমোদিত জবাইখানা ছাড়া কোথাও পশু জবাই হচ্ছে কি না, মাংসের স্বাস্থ্যসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ হচ্ছে কি না এবং বাজারে মাংসের পরিচয় গোপন করে অন্য নামে বিক্রি হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত নজরদারি করতে হবে।

এখানে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। আইন ভাঙার দায়ে শাস্তি হওয়া প্রয়োজন, কিন্তু একই সঙ্গে এই চক্রের পেছনে থাকা ব্যক্তি বা অর্থদাতাদেরও শনাক্ত করা দরকার। শুধু ঘটনাস্থলে থাকা শ্রমিকদের শাস্তি দিয়ে মূল হোতাদের বাইরে রাখা হলে একই ধরনের কর্মকাণ্ড আবার ঘটতে পারে। সিংগাইর উপজেলার হিরু নামের ব্যক্তি যে ওই ৯ জনকে ঘোড়া জবাইয়ের জন্য ভাড়া করেছিলেন, এ কথা পুলিশকে মনে করিয়ে দেওয়া হলো।